ব্রাজিলের ফুটবল দল আসছে কলকাতায়। ৩ অক্টোবর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দেখতে মুখিয়ে গোটা দেশ। তার মধ্যেই আশাবাদী এক ব্রাজিলীয়— ভারতে পা রাখার পর তাঁর দেশের ফুটবলাররাও এ দেশের ফুটবলপ্রেমে মজে যাবেন। তাঁর কথায়, ‘আমি নিশ্চিত, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকারা কলকাতা এবং ভারতকে ভালবেসে ফেলবে। এ ভালবাসা এড়িয়ে যাওয়া যায় না’।
তিনি হোসে রামিরেজ ব্যারেটো— ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে খেলা অন্যতম সেরা বিদেশি ফুটবলার। মোহনবাগানের জার্সি গায়ে দীর্ঘ সময় খেলেছেন। মহিন্দ্রা ইউনাইটেডের হয়েও খেলেছেন তিনি। পাশাপাশি ব্রাজিলের গ্রেমিওর হয়েও মাঠে নেমেছেন তিনি। কলকাতায় দীর্ঘ দিন থাকার সুবাদে শহরের ফুটবল-আবেগ তাঁর অজানা নয়। তাই ব্রাজিলের ভারত সফরকে ঘিরে তাঁর রোমাঞ্চও কম নয়।
মজার ব্যাপার হল, ব্রাজিলের নাগরিক হয়েও এখনও গ্যালারিতে বসে দেশের জাতীয় দলের খেলা দেখার সুযোগ হয়নি ব্যারেটোর। এক সর্বভারতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে, কিন্তু আমি কখনও ব্রাজিলের জাতীয় দলকে স্টেডিয়ামে বসে খেলতে দেখিনি। সারা বিশ্বের অসংখ্য সমর্থকের মতো আমিও এই স্বপ্ন দেখি। এমনকী, ব্রাজিলেও সবাই এই সুযোগ পায় না’। এবার তাঁর সেই আক্ষেপ মিটতে চলেছে কলকাতায়।
কারণ ব্রাজিলের ম্যাচ সাধারণত রিও ডি জেনেইরো, সাও পাওলো বা দেশের উত্তরাঞ্চলেই বেশি হয়। দক্ষিণ ব্রাজিলে, যেখানে ব্যারেটোর বড় হয়ে ওঠা, সেখানে জাতীয় দলের ম্যাচ দেখতে পাওয়া সুযোগ বড় একটা পাওয়া যায় না। আর এ বার তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’ কলকাতাতেই ব্রাজিলের খেলা দেখবেন তিনি। তাঁর কাছে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কেন কলকাতা? ব্যারেটোর ব্যাখ্যা, ‘কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানকার মানুষ সব সময় ফুটবলকে ভালবাসে। পাঁচটি বিশ্বকাপ জেতায় ব্রাজিলের জার্সির উপরে থাকা তারাগুলিই শুধু আমাদের জনপ্রিয় করেনি, আমরা যে ভাবে ফুটবল খেলি এবং যে আনন্দ দিই, তার জন্যও মানুষ আমাদের ভালোবাসে’।
৩ অক্টোবরের প্রীতি ম্যাচকে ঘিরে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তুঙ্গে। ভারতে এই প্রথম ম্যাচ খেলতে আসছে ব্রাজিলের ফুটবল দল। ব্যারেটোর মতে, কলকাতায় এসে ব্রাজিল বুঝতে পারবে কেন এই শহরকে ভারতীয় ফুটবলের ‘মক্কা’ বলা হয়। তাঁর বিশ্বাস, ‘ওরা প্রচুর ভালবাসা পাবে’।
ব্রাজিলের শেষ বিশ্বকাপ জয় প্রায় ২৫ বছর আগে। তবু তাদের জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বিশ্বকাপ এলেই কলকাতার একাংশ ব্রাজিলের পতাকা, জার্সিতে ঢেকে যায় আর সমর্থকদের উন্মাদনা তখন শহরের চেনা ছবি হয়ে ওঠে। সেই আবেগই এ বার সরাসরি দেখতে পাবেন ব্রাজিলীয় ফুটবলাররা।
তবে ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ব্যারেটো। আইএসএল নিয়ে অনিশ্চয়তা, জাতীয় দলের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন সংস্থার ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের সব কিছু একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা চলবে না। ব্রাজিলের সঙ্গে এখানকার সমস্যার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং ব্রাজিলের এই সফর ভারতীয় সমর্থকদের কাছে বিরল সুযোগ’।
মাঠের লড়াই অবশ্য একেবারেই একপেশে হওয়ার সম্ভাবনা। ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম সেরা দল, আর ভারত বর্তমানে ১৩৮ নম্বরে। ব্যারেটোর ধারণা, ‘কোচ কার্লো আনসেলোত্তি হয়তো কলকাতায় সেরা একাদশ নামাবেন না। কারণ, তার আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দু’টি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলার কথা ব্রাজিলের। তার পর চার্টার্ড বিমানে কলকাতায় আসবে দল। তবে হলুদ জার্সি পরে যে-ই মাঠে নামুক, তার পরিচয় একটাই— ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের প্রতিনিধি। আর কলকাতার গ্যালারি যে তাঁদের ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে, সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই ব্যারেটোর।
তিনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালে ভারতে আসার পর থেকেই আমি এই ভালবাসা অনুভব করেছি। অন্য কোনও দলের এত সমর্থক নেই। কলকাতায় আর্জেন্টিনারও অনেক সমর্থক রয়েছে, কিন্তু সেই ভালোবাসার বড় কারণ এক জনই— লিওনেল মেসি। ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা চিরন্তন এবং সার্বজনীন’।
ফলে ৩ অক্টোবর শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়—ব্রাজিলের কাছে কলকাতাকে চেনার, আর কলকাতার কাছে নিজেদের ফুটবল-আবেগ নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার এক বিরাট সুযোগ। ব্যারেটোর বিশ্বাস, মাঠে নামার পর তাঁর দেশের তারকারাও বুঝবেন—কেন কলকাতাকে বলা হয় ভারতীয় ফুটবলের মক্কা।




