সুপ্রিম কোর্টের মতে, শুধু বিবাহিত নারীই নন, বিবাহসদৃশ লিভ-ইন (Live in) সম্পর্কে থাকা নারীরাও যদি শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তবে তাঁদের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারা (এবং নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫ ধারা)-র আওতায় এমন সম্পর্কগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছে। অর্থাৎ, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের দ্বারা যে ধরনের নির্যাতনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে, তা এখন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে লিভ-ইন (Live in) সঙ্গীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
এই রায়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল— আইনকে স্থির নয়, পরিবর্তনশীল সমাজের প্রতিফলন হিসেবে দেখা। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, সমাজের মূল্যবোধ সময়ের সঙ্গে বদলায়, এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনকেও বিকশিত হতে হয়। একসময় যেমন সমলিঙ্গ সম্পর্ককে অপরাধ বলে গণ্য করা হত, আজ তা স্বীকৃতি পেয়েছে; তেমনই লিভ-ইন (Live in) সম্পর্কও আজ আর অস্বাভাবিক নয়।
তবে এই রায় কোনোভাবেই সব ধরনের লিভ-ইন (Live in) সম্পর্ককে আইনের সুরক্ষার আওতায় আনেনি। আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে— শুধুমাত্র সেই সম্পর্কগুলিই এই আইনের অন্তর্ভুক্ত হবে, যেগুলি বিবাহের মতো বা স্থায়ী ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ, ক্ষণস্থায়ী বা শুধুমাত্র সহবাসের সম্পর্ক নয়, বরং যেখানে একসঙ্গে থাকা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক স্বীকৃতির উপাদান রয়েছে, সেগুলিই বিবেচিত হবে।
এখানেই উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কীভাবে নির্ধারিত হবে যে কোনো লিভ-ইন (Live in) সম্পর্ক ‘বিবাহসদৃশ’ কিনা? আদালত এই দায়িত্ব প্রাথমিকভাবে অভিযোগকারী নারীর ওপরই দিয়েছে। অর্থাৎ, তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে যে সম্পর্কটি কেবল অস্থায়ী নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ও দায়িত্বপূর্ণ ছিল। এই দিকটি যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই কিছু ক্ষেত্রে এটি নারীর জন্য চ্যালেঞ্জও হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সুপ্রিম কোর্ট ৪৯৮এ ধারার সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অতীতে এই ধারাকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। আদালত তাই সতর্ক করে দিয়েছে, এই আইন যেন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রয়োগ করা হয়, অপব্যবহার না হয়।
এই রায় আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তা দেয়— নির্যাতন কোনও সম্পর্কের ধরন দেখে আসে না। একজন নারী বিবাহিত হোন বা লিভ-ইন (Live in) সম্পর্কে থাকুন, তাঁর প্রতি হিংসা বা মানসিক নির্যাতন সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। ‘নির্যাতন দরজায় কড়া নাড়ে না’— আদালতের এই মন্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হিংসার বিরুদ্ধে আইনের অবস্থান সর্বত্র সমান হওয়া উচিত।
ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সমতার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, এই রায় তারই একটি বাস্তব প্রয়োগ। বিবাহিত ও অবিবাহিত— এই বিভাজনের ভিত্তিতে আইনি সুরক্ষায় বৈষম্য রাখা যুক্তিসঙ্গত নয়, এই কথাই আদালত স্পষ্ট করেছে। সুতরাং, এই রায় শুধু আইনি নয়, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।




