কুমোরটুলি মানেই এক বিস্ময়ের জগৎ। বছরের পর বছর ধরে এখানেই বাঁশ, খড়, মাটি আর কাপড় মিলিয়ে তৈরি হয় দেবী দুর্গার অপূর্ব প্রতিমা। শুধু দুর্গা নয়, বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তিও গড়ে ওঠে এই ছোট্ট পাড়ায়। শরৎ এলেই কুমোরটুলি যেন এক বিশেষ ছন্দে জেগে ওঠে— কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় মাটি। এই ঐতিহ্য শুধুমাত্র শিল্প নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার।
২০২১ সালে দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই কুমোরটুলিকে ঘিরে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে। এই পাড়াকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে— এ এক ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ, কুমোরটুলির শিল্পীদের নিষ্ঠা, দক্ষতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পচর্চা সত্যিই বিরল।
তবে এই বিস্ময়ের পেছনের বাস্তব ছবিটা কিন্তু খুব সুখকর নয়। কুমোরটুলির সরু, অস্বাস্থ্যকর গলি, ছোট ছোট ঘিঞ্জি কর্মশালা— এই পরিবেশেই তৈরি হয় এত বড় বড় শিল্পকর্ম। অনেক সময় পর্যাপ্ত আলো-বাতাসও থাকে না। তবুও এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই শিল্পীরা তাঁদের কাজ চালিয়ে যান। আশ্চর্যের বিষয়, এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও এমন সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে প্রায় একই রকম অবস্থায় রয়েছে এই এলাকা, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাগুলি আরও বেড়েছে বলেই মনে হয়।
২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার কুমোরটুলির শিল্পীদের অন্যত্র স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিল। বড় জায়গায় আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। ফলে সমস্যাগুলি আজও রয়ে গিয়েছে আগের মতোই।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেলে সাধারণত পর্যটনের প্রসার ঘটে। তাতে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়। কুমোরটুলির ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে— এই জায়গাটি কি আদৌ পর্যটনের জন্য প্রস্তুত?
কুমোরটুলির সরু গলিতে যখন অনেক দর্শনার্থী ভিড় করেন, তখন শিল্পীদের কাজের অসুবিধা হয়। বড় বড় প্রতিমা তৈরির জন্য জায়গার প্রয়োজন হয়। অনেক শিল্পী মনে করেন, প্রতিমার চোখ আঁকার মতো কিছু কাজ খুব ব্যক্তিগত এবং পবিত্র— এও যেন একপ্রকার পুজো। সেখানে বাইরের মানুষের উপস্থিতি তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। তাই কুমোরটুলিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে খুব সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
এর পাশাপাশি আরও কিছু গুরুতর সমস্যা রয়েছে। প্রতিমা তৈরির জন্য যে মাটি দরকার, তা মূলত নদী থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন আইন ও নিয়মের কারণে সেই মাটির জোগান অনিয়মিত হয়ে পড়েছে এবং খরচও বেড়েছে। সম্প্রতি মাটির সংকটও দেখা দিয়েছে। আবার এই কাজটি মরসুমি— বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই বেশি কাজ থাকে। বাকি সময়ে অনেক শিল্পীকেই আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো অর্থ পাওয়া। অনেক সময় প্রতিমা তৈরির পরেও শিল্পীরা সময়মতো পুরো টাকা পান না। কখনও দেরিতে, কখনও আংশিক টাকা দেওয়া হয়। অথচ কাঁচামালের দাম দিন দিন বাড়ছে। বর্ষার সময়ে কাজ করতে গিয়ে প্রতিমা শুকোতে সমস্যা হয়, ফলে অতিরিক্ত খরচ হয়। এই সব মিলিয়ে শিল্পীদের জীবনযাপন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
এই অবস্থার প্রভাব পড়ছে নতুন প্রজন্মের উপরও। অনেক তরুণ এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজের দিকে ঝুঁকছেন, কারণ এখানে আর্থিক স্থায়িত্ব নেই। ফলে এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এই প্রেক্ষিতে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি শুধুমাত্র সম্মানের বিষয় নয়, এটি বাস্তব পরিবর্তনের সুযোগও এনে দিতে পারে। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা যায়, তবে শিল্পীদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ, নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। তরুণদের এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে— যেমন কর্মশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদি।
কুমোরটুলি শুধুমাত্র একটি পাড়া নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি সহায়তা এবং সচেতনতা। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি সেই পথে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে বাস্তব সমস্যার সমাধান করাটাও সমান জরুরি।
শিল্প আর ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হলে শিল্পীদের জীবনও সুরক্ষিত করতে হবে। কুমোরটুলির মাটির প্রতিমার মতোই, এই ঐতিহ্যও যত্নে গড়ে তুলতে হবে— তবেই তা আগামী প্রজন্মের কাছে অমলিন থাকবে।




