• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 1 August, 2026

‘বাবা চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, সব শেষ’, তার পরও তাঁর অদম্য লড়াইয়ের কাহিনী শোনালেন ঐতিহাসিক সোনাজয়ী অস্মিতা

১২ বছর বয়স থেকেই জুডোর টানে বাড়ি ছাড়েন অস্মিতা। এক ট্যালেন্ট সার্চ প্রকল্পে নির্বাচিত হওয়ার পর গণেশবাবু তাঁর মেয়েকে কোচের হাতে তুলে দিয়ে হাত জোড় করে বলেন, ‘স্যার, আমরা খুব ছোটখাটো মানুষ। আমার মেয়েকে একজন বড় মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করুন’

‘বাবা চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, সব শেষ’, তার পরও তাঁর অদম্য লড়াইয়ের কাহিনী শোনালেন ঐতিহাসিক সোনাজয়ী অস্মিতা

Image: SNS

জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের মুহূর্তে যাঁর সঙ্গে এই আনন্দ ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় সোনার পদকজয়ী অস্মিতা দে, তিনি অস্মিতার বাবা প্রয়াত গণেশ দে। তাই শুক্রবার রাতে ঐতিহাসিক সোনাজয়ের পর কান্নায় ভাসলেন সোনার মেয়ে।

গেমসের নবম দিনে সোনার পদক জেতেন ত্রিপুরার বাঙালি মেয়ে অস্মিতা দে। এই প্রথম কমনওয়েলথ গেমসে জুডো থেকে সোনা জিতলেন কোনো ভারতীয়। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতীয় জুডোর ইতিহাসে অস্মিতার কীর্তি ছিল ঐতিহাসিক। মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে কানাডার হেইদি কোয়াচকে হারিয়ে সোনা জেতেন অস্মিতা।

 

কিন্তু সেই আনন্দ যাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন উত্তর প্রদেশ পুলিসের ২২ বছর বয়সি এই সাব ইন্সপেক্টর, তাঁকে কাছে না পাওয়ায় চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তিনি।

২০০৩-এর ২২ মার্চ দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সদর শহর বেলোনিয়ায় জন্ম অস্মিতা দে-র। অদম্য লড়াই আর অধ্যবসায়ের জোরেই তাঁর এই ঐতিহাসিক উত্থান। সাইকেল মেরামতির দোকান চালানো এক সাধারণ বাবার অসাধারণ মেয়ে অস্মিতা সীমিত সুযোগ-সুবিধা আর আর্থিক প্রতিকূলতাকে জয় করেই পৌঁছে গিয়েছেন সাফল্যের শিখরে।

অস্মিতার বাবা ছিলেন একজন সাইকেল মেকানিক। প্রতিদিন মাত্র ৩০০ টাকার মতো আয় করে ত্রিপুরার একটি ছোট গ্রামে মাটির বাড়িতে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন তিনি। চলতি বছরের গোড়াতেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। বাবা চলে যাওয়ার সেই শূন্যতা নিয়েই কমনওয়েলথ গেমসে ইতিহাস গড়লেন অস্মিতা।

সেই আনন্দময় মুহূর্তেও তাঁর বারবার মনে পড়ছিল সেই মানুষটির কথা, যিনি দেশের আর পাঁচজনের অনেক আগে থেকেই তাঁর মেয়ের স্বপ্ন সফল হওয়ার সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন।

শুক্রবার রাতে কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে জুডোয় ভারতের প্রথম পদক জয়ের পর আবেগ মেশানো কণ্ঠে অস্মিতা বলেন, ‘আমি ত্রিপুরার খুব ছোট্ট একটা গ্রামের মেয়ে। আমাদের ওখানে কেউ এত বড় স্বপ্ন দেখে না। কিন্তু বাবা সবসময় আমার পাশে ছিলেন, আমাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন’।

সংসারে সব সময়ই টানাটানি লেগে থাকত। বাবার দৈনিক সামান্য আয়ে কোনও রকমে চলত পরিবারের খরচ। কিন্তু আর্থিক অনটনকে কখনও মেয়ের স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে দেননি। জুডোর প্রতি অস্মিতার ভালোবাসাকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন।

১২ বছর বয়স থেকেই জুডোর টানে বাড়ি ছাড়েন অস্মিতা। এক ট্যালেন্ট সার্চ প্রকল্পে নির্বাচিত হওয়ার পর গণেশবাবু তাঁর মেয়েকে কোচের হাতে তুলে দিয়ে হাত জোড় করে বলেন, ‘স্যার, আমরা খুব ছোটখাটো মানুষ। আমার মেয়েকে একজন বড় মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করুন’।

এর পর থেকে বেশিরভাগ সময়েই ঘর ছেড়ে দূরে দূরে কাটিয়েছেন অস্মিতা। জুডোর আসরে নামতে পাড়ি দিয়েছেন বহু জায়গায়। পয়সা বাঁচানোর জন্য বেশিরভাগ সময়েই ট্রেনে টিকিট ছাড়াই সফর করতেন তিনি। এক অসম্ভব লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য। সব সময়ই বাবা তাঁর খবর রাখতেন।

একবার গুরুতর হাঁটুর চোটে যখন অস্মিতার কেরিয়ারই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন তিনিই মেয়েকে চিকিৎসার জন্য দিল্লি নিয়ে গিয়েছিলেন, ওষুধ কিনে দিয়েছিলেন এবং নিজের সাধ্যের মধ্যে যা কিছু সম্ভব, সব করেছিলেন, যাতে অস্মিতা ফের ম্যাটে ফিরতে পারেন।

‘বাবাই আমাকে চিকিৎসার জন্য দিল্লি নিয়ে গিয়েছিলেন। ওষুধও কিনে দিয়েছিলেন’, স্মৃতিচারণ করেন অস্মিতা। কিন্তু কমনওয়েলথ গেমসে যোগ্যতা অর্জন করার কয়েকদিন আগেই বাবার আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। যিনি সবসময় সাহস জুগিয়েছেন, যিনি তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন, তাঁকে হারানোর পর অস্মিতার মনে হয়েছিল, বড় মঞ্চে খেলার স্বপ্নও যেন শেষ হয়ে গেল। কিন্তু সেই কঠিন সময়ে নিঃশব্দে স্বামীর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর মা।

বাবার শেষকৃত্যের মাত্র ১০ দিন পরই মেয়েকে আবার অনুশীলনে ফিরে যেতে বলেন অস্মিতার মা। তিনি মেয়েকে বলেছিলেন, ‘আজ যদি তোকে থামিয়ে দিই, তা হলে তোর বাবা ভাববে, আমি তোর স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছি’। মায়ের কথাতেই ফের ব্যাগ গুছিয়ে ভোপালের স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (SAI) কেন্দ্রে ফিরে যান অস্মিতা। কমনওয়েলথ গেমসের আগে তাঁকে তাড়া করে বেড়াত উদ্বেগ। একের পর এক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন তিনি।

‘এই পদকের জন্য আমি ভীষণ পরিশ্রম করেছি। পদক জেতার আগে ভারতে থাকাকালীন ঠিক করে ঘুমোতেই পারতাম না। সারাক্ষণ লড়াইয়ের কথাই ভাবতাম। শরীর ক্লান্ত থাকলেও ঘুম আসত না। খুব অস্থির লাগত। তারপর ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে আবার অনুশীলনে চলে যেতাম’, বলেন অস্মিতা।

গ্লাসগোয় পৌঁছেও সেই স্নায়ুর চাপ কাটেনি। অস্মিতা বলেন, ‘এখানে আসার পরও খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, কী হবে! তখন শুধু নিজেকেই বলেছি, আমাকে সবাইকে হারাতেই হবে, সোনা জিততেই হবে’।

২০২৩-এ তিনি উত্তরপ্রদেশ পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। এই চাকরি তাঁকে তাঁর লক্ষ্যপূরণের পথে অনেক সাহায্য করে। স্বপ্ন পূরণের জেদ শুধু অনুশীলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছোট ছোট আনন্দকেও তিনি ত্যাগ করেছিলেন সোনার স্বপ্নের জন্য।

একবার অস্মিতার ভাই তাঁর দিদির প্রিয় মিষ্টি ‘লবঙ্গ লতিকা’ কিনে বাড়ির ফ্রিজে রেখে দিলেও সেই মিষ্টিতে একবারও হাত দেননি অস্মিতা। সেই প্রসঙ্গ উঠতে এই প্রথম অস্মিতার মুখে হাসি দেখা যায়। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, ‘ফ্রিজে মিষ্টিটা দেখতাম। অনেকবারই খেতে ইচ্ছে হয়েছে। প্রায় খেয়েই ফেলছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খুব কষ্ট করে নিজেকে আটকাই’।

অবশেষে সেই সব ত্যাগ, কষ্ট, চোখের জল আর অদম্য লড়াইয়েরই ফল পেলেন ত্রিপুরার সোনার মেয়ে। গলায় ঝুলল সোনার পদক, বেজে উঠল দেশের জাতীয় সঙ্গীত। আর সেই সোনার হাত ধরেই ভারতীয় জুডোর ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখলেন অস্মিতা দে। আসলে কিছু কিছু সাফল্য পুরস্কার, পদকের সীমাকেও ছাড়িয়ে উঠে যায় অনেক ওপরে। অস্মিতা দে-র কীর্তি তেমনই এক সাফল্য।