মানিব্যাগে আধার কার্ড (Aadhaar Card), প্যান কার্ড (PAN Card) কিংবা ব্যাংকের পাসবই থাকলেই যে কেউ নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করতে পারবেন, এমনটা আর ভাবার কারণ নেই। কলকাতা হাইকোর্ট সম্প্রতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই ধরনের পরিচয়পত্র নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ (conclusive proof) হতে পারে না। রাজ্যের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে যখন গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নাগরিকত্ব-বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নতুন করে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে।
মুর্শিদাবাদের মামলা
ঘটনার সূত্রপাত মুর্শিদাবাদ থেকে। জুন মাসে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটক হন নাসির মোল্লা নামে এক ব্যক্তি। তাঁর পরিবারের দাবি, নাসির প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাগরিক, এবং তাঁর কাছে আধার ও প্যান কার্ডও রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের সময় এসআইআর-এর খসড়া তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ পড়ে যায়। পরিবারের তরফে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়, যাতে তাঁর মুক্তির আর্জি জানানো হয়।
বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ সাব্বার রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ যখন নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি দেখতে চায়, তখন পিটিশনকারীর আইনজীবী স্বীকার করে নেন, জমির দলিল ছাড়া নাসিরের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো নিশ্চিত কোনও নথি তাঁদের হাতে নেই। আদালত অবশ্য সেই যুক্তিও খারিজ করে দেয়। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, একজন বিদেশি নাগরিকও ভারতে সম্পত্তি কিনতে পারেন আইনত, তাই শুধু জমি থাকলেই কেউ ভারতীয় নাগরিক হয়ে যান না।
কেন আধার-প্যান যথেষ্ট নয়
রাজ্য সরকারের তরফে আদালতে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদে নাসির নাকি স্বীকার করেছিলেন, তাঁর জন্ম বাংলাদেশের রহিমপুরে, এবং প্রায় চোদ্দো-পনেরো বছর আগে অবৈধভাবে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। এই প্রেক্ষাপটেই আদালত মন্তব্য করে, নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ (Citizenship Act, 1955) অনুযায়ী নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয় জন্ম, বংশপরিচয় বা পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে, শুধু পরিচয়পত্র দেখিয়ে নয়। আধার কার্ড দেওয়া হয় আধার আইন ২০১৬ (Aadhaar Act, 2016) অনুযায়ী বাসিন্দা হিসেবে, প্যান কার্ড দেওয়া হয় আয়কর দপ্তরের তরফে করদাতা পরিচয় হিসেবে। দুটোরই উদ্দেশ্য পরিষেবা পাওয়া সহজ করা, নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা নয়। একই যুক্তিতে ব্যাংকের পাসবই বা ভোটার কার্ডও নাগরিকত্বের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য হয় না বলে আদালত জানিয়েছে।
দেশজুড়ে একই সুর
এই অবস্থান শুধু কলকাতা হাইকোর্টের একার নয়। কিছুদিন আগেই বম্বে হাইকোর্ট একই ধরনের একটি মামলায় জানিয়েছিল, আধার, প্যান বা ভোটার কার্ড তিনটে একসঙ্গে থাকলেও তা কাউকে স্বতঃসিদ্ধ ভাবে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করে না। বিহারের এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্টও নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) এই যুক্তি মেনে নিয়েছে যে আধার কার্ড নাগরিকত্বের নিশ্চিত প্রমাণ নয়, তাই যাচাই ছাড়া তা গ্রহণ করা যায় না। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি গুয়াহাটি হাইকোর্টের ২৭টি রায়ও খারিজ করে দিয়েছে, যেখানে বিদেশি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত কেন মেনে নেওয়া হয়েছিল, এমন প্রশ্নও তোলা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য জরুরি
এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বহু পরিবারের কাছে আধার-প্যান থাকলেও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো পুরনো নথি, যেমন জন্ম শংসাপত্র বা পূর্বপুরুষের বাসস্থানের প্রমাণ, অনেক সময়েই অমিল। এই রায়ের ফলে এখন স্পষ্ট, শুধু পরিচয়পত্র দেখিয়ে আর কাজ চলবে না। যাঁদের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ছে, তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণে অতিরিক্ত ও যথাযথ নথির উপরেই নির্ভর করতে হবে। বিদেশি আইন ১৯৪৬ (Foreigners Act, 1946) অনুযায়ী প্রমাণের দায়ও থাকছে ব্যক্তির উপরেই, প্রশাসনের উপর নয়। এই কারণে আইনজীবী মহল থেকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, শুধু আধার-প্যান-পাসবই নয়, জন্মের সময়কার নথি, স্কুল-শংসাপত্র বা পূর্বপুরুষের ভোটার তালিকার তথ্যও এখন থেকে সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখা জরুরি।
নাসির মোল্লার মামলাটি আপাতত বিচারাধীন, পরবর্তী শুনানিতে অতিরিক্ত নথি জমা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে আদালত। কিন্তু এই রায় ইতিমধ্যেই একটি বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে, নাগরিকত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে শুধু পরিচয়পত্রের উপর ভরসা করলে চলবে না।




