পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক সামাজিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে দৈনিক স্টেটসম্যানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে অংশ নিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পশ্চিমবঙ্গ সাধারণ সম্পাদক ও গণমাধ্যম মুখপাত্র জিষ্ণু বসু।
পেশগত জীবনে সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পূর্বক্ষেত্রের সহ প্রচার প্রমুখ।
দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজ্য ও জাতীয় বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়ে তিনি নিয়মিত মতামত প্রকাশ করে থাকেন। একদিকে যেমন জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক সমতা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি, তেমনই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক জাগরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে বলেছেন তিনি।
*প্রশ্ন: বর্তমান প্রজন্ম একদিকে যেমন প্রযুক্তি ও সমাজমাধ্যমের যুগে বেড়ে উঠছে, অন্যদিকে ভুয়ো প্রচার, মতাদর্শগত বিভ্রান্তি, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সংকটের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে ও সঠিক পথে পরিচালিত করতে কী কী পদক্ষেপ জরুরি বলে আপনি মনে করেন?*
*জিষ্ণু বসু:* নতুন প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ হল ভারতবর্ষকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। বিদেশি শক্তি অর্থ, প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেটের মাধ্যমে টুলকিট এবং বিভিন্ন মডিউলের মাধ্যমে যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। সমাজমাধ্যমে যাদের বহু ফলোয়ার্স রয়েছে, যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন তাঁদের অর্থের প্রলোভন দেখে যুবসমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করে তাঁদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার প্রচেষ্টা চলছে।
তাই শুধু যুবসমাজ নয়, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা। দেশের ঐক্য অখন্ডতা রক্ষার বিষয়ে তাদের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে।
*প্রশ্ন: গত ১৫ বছরের শিক্ষাক্ষেত্রে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেভাবে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত করা হয়েছে, পালাবদলের পর এবার সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?*
*জিষ্ণু বসু:* জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ , সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে এখনও তা সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি।
স্কুল ও কলেজে নিয়োগ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি হয়েছে তা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বহু শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। সরকারের কাছে একটাই আবেদন, শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা হোক এবং যোগ্য ব্যক্তিদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
জিষ্ণু বসুর দাবি, এই শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির পেছনে ‘কালচারাল মার্কসিজম’ বড় ভূমিকা পালন করছে। তার মধ্যে এই মতাদর্শের উদ্দেশ্য ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে ঘৃণা তৈরি করা। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন কালচারাল মার্কসিজম ও মৌলবাদ একে অপরকে সহায়তা করে সমাজকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে এর এই প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন।
*প্রশ্ন: সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ এবং তার প্রভাব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। গত প্রায় ১৫ বছরের এই পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সরকার পালাবদলের পর রাজ্যের উন্নয়ন নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। আপনার মতে এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে বর্তমান ডবল ইঞ্জিন সরকারের কী ভূমিকা থাকা উচিত? এই বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?*
*জিষ্ণু বসু:* শুধু সরকার পরিবর্তন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। কোনও রাজনৈতিক দল সমাজের ভাগ্য নির্ধারণ করে না। এই সরকার যদি মানুষের জন্য কাজ করে তাহলে অবশ্যই ভালো। কিন্তু সরকার কাজ না করলে আবারও সেই একই দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হবে আমাদের। সমাজে দুর্নীতিগ্রস্তদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। তবে শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই হবে না সমাজেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
গত ১৫ বছরের সমাজের শুভ বুদ্ধির অনেক মানুষ নীরব থেকেছেন। যাঁরা কবি, সাহিত্যিক, লেখক বা বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মালিক — তাঁদের অনেকেই এই দুর্নীতিগ্রস্তদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হওয়ার বদলে সেই দুর্নীতির সঙ্গে আপস করেছেন। এতে সমাজের আরও বড় ক্ষতি হয়েছে। তাই বাংলার জাগরণ বলতে আমি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনকেই বোঝাই না– সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক জাগরণও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ভোটের ফলাফল যদি বিচার করা হয় তাহলে সমাজ জিতেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ রায় দিয়েছে এবং সেই অর্থে ভারতবর্ষ জিতেছে। পশ্চিমবঙ্গে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে তা দেশের মানুষ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে বলেন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় যেমন সারা ভারত বাংলার পাশে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। তাঁর দাবি, বাংলার জাগরন কেবল বাংলার জন্য নয় গোটা ভারতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
*প্রশ্ন: অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আপনার অবস্থান কী?*
*জিষ্ণু বসু:* একই দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক দেওয়ানি আইন থাকলে একটি সমাজ সুস্থভাবে চলতে পারে না। তিনি সংবিধানের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আদিবাসীদের সাংবিধানিক বিশেষ অনুষ্ঠান নিয়ে তার কোনও আপত্তি নেই, তবে ধর্মভিত্তিক পৃথক দেওয়ানি বিধি সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
বাবাসাহেব আম্বেদকর প্রথম থেকেই এক দেশ, এক দেওয়ানি বিধির পক্ষে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সকল নাগরিকের জন্য সমান আইন কার্যকর হোক। পরে তা রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিতে রাখা হলেও তিনি চেয়েছিলেন রাজ্যগুলি দ্রুত সহমতের ভিত্তিতে তা কার্যকর করুক।
রাজনৈতিক কারণ, মৌলবাদ এবং জিহাদি মৌলবাদের চাপে এতদিন এই আইন কার্যকর করা যায়নি বলে তাঁর মত।
দেওয়ানি বিধি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি ১৯৮৫ সালের শাহ বানো মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ১৯৮৫ সালের শাহ বানো মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীর ভরণপোষণের পক্ষে ও ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। সেই সময় কংগ্রেসের নিষ্ঠুর আচরণ নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে ফের ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী সরকার নতুন আইনে সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ের কার্যকারিতা অনেকটাই নষ্ট করে দেয়।
সেই সময় কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ই.এম.এস. নাম্বুদিরিপাদ দৃঢ়ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি নিজের অবস্থান বদলাননি। কিন্তু বর্তমানে বাংলার বামপন্থীরা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলেই আমার মত। বর্তমান সময়ে রাজ্যের বামপন্থী দলগুলি নিজেদের টিকিয়ে রাখতে একটি সম্প্রদায়ের দলের সঙ্গে জোট বেধেছেন বলে তিনি জানান।
বহুগামিতা এবং নারী-শিশুর অধিকার নিয়েও জিষ্ণু বসু বলেন,
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, পরিবারে বহুগামিতা থাকলে শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়। স্বাধীনতার পরে ভারতীয় সমাজ এই প্রথা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছে। তাই আমার বিশ্বাস, বাংলার মানুষও বিষয়টি যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করবেন এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন।




