প্রতি বছর ২৬ জুলাই, ভারত থেমে দাঁড়ায় কার্গিলের দুর্গম শৃঙ্গগুলি পুনর্দখল করতে গিয়ে যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন এবং প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাঁদের স্মরণে। আমাদের মতো যাঁরা সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছি, তাঁদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে কখনও ম্লান হয় না। একই সঙ্গে এটি এমন একটি প্রশ্নও সামনে আনে, যা খুব কমই সরাসরি উচ্চারিত হয়: যখন ভারত এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, যার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না, এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে সুসংহতভাবে বসে ছিল, তখন কোন দেশ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল?
উত্তরটি আজ নথিভুক্ত সামরিক ইতিহাসের অংশ। সেই দেশ ছিল ইসরায়েল।
১৯৯৯ সালের বসন্ত ভারতের সামরিক প্রস্তুতির একাধিক গুরুতর ঘাটতি স্পষ্ট করে দেয়। কার্গিল-দ্রাস সেক্টরের দুর্গম পাহাড়চূড়াগুলি পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে ছিল। এমন উচ্চতায় প্রচলিত স্থলে আক্রমণ চালানো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রাণঘাতী। তাদের সেখান থেকে উৎখাত করতে হতো, আবার একই সঙ্গে কঠোর নির্দেশ ছিল নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) অতিক্রম করা যাবে না। ভারতীয় স্থলসেনা যখন শত্রুর গুলির মুখে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছিল, তখন ভারতীয় বায়ুসেনার দায়িত্ব ছিল নির্ভুল বিমান সহায়তা প্রদান করা। কিন্তু মূল সমস্যা ছিল লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা। সংকীর্ণ আকাশসীমায় পরিচালিত বিমান থেকে খাড়া ও সরু পাহাড়ি চূড়ায় অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুর ওপর অনির্দেশিত বোমা নিক্ষেপ কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছিল না। মিরাজ ২০০০এইচ যুদ্ধবিমানের লেজার-নির্দেশিত অস্ত্র বহনের সক্ষমতা থাকলেও লাইটেনিং লেজার ডিজাইনেটর পড-এর সমন্বয় তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালের পোখরান পরমাণু পরীক্ষার পর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ঘাটতি দ্রুত পূরণের জন্য ভারতের হাতে বিকল্প পথও ছিল খুবই সীমিত।
সেই সময় ইসরায়েল ছিল এমনই এক নির্ভরযোগ্য অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের অস্ত্র সরবরাহ বিলম্বিত করার চাপ উপেক্ষা করে ইসরায়েল ভারতকে লাইটেনিং পড এবং মিরাজ যুদ্ধবিমানগুলিকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় লেজার-নির্দেশিত গোলাবারুদ সরবরাহ করে। পাশাপাশি, স্থলযুদ্ধের প্রধান ভরসা বোফর্স আর্টিলারির জন্য ১৫৫ মিমি গোলাবারুদ এবং সার্চার ও হেরন মানববিহীন নজরদারি বিমানও সরবরাহ করে, যার মাধ্যমে ভারত প্রথমবারের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে শত্রুর অবস্থানের ওপর ধারাবাহিক নজরদারির সক্ষমতা অর্জন করে।
১৯৯৯ সালের ২৪ জুন, একটি মিরাজ ২০০০এইচ যুদ্ধবিমান লাইটেনিং পড ব্যবহার করে টাইগার হিলের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ড ও কন্ট্রোল কাঠামোর বিরুদ্ধে লেজার-নির্দেশিত বোমা নিক্ষেপ করে। ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসে এটিই ছিল লেজার-নির্দেশিত বোমার প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যবহার। যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। টাইগার হিল পুনর্দখল করা হয়।
এই ঘটনা কেবল সামরিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়। এটি ভারত-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সম্পর্কের মৌলিক চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়: এমন একটি সম্পর্ক, যা নির্ভরযোগ্য, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে। কার্গিল যুদ্ধের সময় ভারতের বহু ঐতিহ্যগত অস্ত্র সরবরাহকারীর আচরণ ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা মূলত সেই শিক্ষার ভিত্তিতেই নির্মিত হয়।
কার্গিল যুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলিতে ভারত পরিকল্পিতভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের সামরিক ভাণ্ডারের অংশ করে তোলে। হেরন ও সার্চার মানববিহীন নজরদারি বিমান (UAV) নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির সক্ষমতা প্রদান করে। ফ্যালকন আকাশভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ভারতের আকাশপথে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার পরিধি আরও বিস্তৃত করে। স্পাইক অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র স্থলসেনার হাতে পৌঁছায়। আরও একটি ইসরায়েলি নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থা স্পাইস-২০০০ গাইডেড বোমা কিট ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে জইশ-ই-মহম্মদের প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পরিচালিত বালাকোট অভিযানে ব্যবহার করা হয়। এই প্রতিটি সংযোজনের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে, কিন্তু তখনও পর্যন্ত এই সম্পর্ক কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার সীমা অতিক্রম করে যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়নের আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
২০২৫ সালের মে মাসে পরিচালিত অপারেশন সিঁদুর সেই যাত্রায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মহম্মদের অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ভারতের অভিযানে ব্যবহৃত হয় ইসরায়েল-নির্মিত হারোপ লয়টারিং মিউনিশন এবং স্পাইস-২৫০ প্রিসিশন বোমা কিট। হারোপ, এমন এক ধরনের লয়টারিং মিউনিশন যা নজরদারি ও আঘাত হানার মধ্যবর্তী ব্যবধানকে একটি একক ব্যবস্থায় রূপ দেয়, ভারতের সন্ত্রাসবাদবিরোধী ও সীমান্তপারের আঘাত হানার সক্ষমতায় এক গুরুত্বপূর্ণ মতবাদগত পরিবর্তনের পরিচয় বহন করে, যার প্রয়োজনীয়তা কার্গিলের অভিজ্ঞতাই সামনে এনেছিল। একই প্ল্যাটফর্মে ভারতীয় সামরিক মতবাদ এবং ইসরায়েলি প্রযুক্তির সমন্বয় এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জেরুজালেম শীর্ষ সম্মেলন এই কৌশলগত ধারাবাহিকতাকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যখন আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বে (Special Strategic Partnership for Peace, Innovation and Prosperity) উন্নীত করেন, তখন তাঁরা নতুন কিছু সৃষ্টি করেননি। তাঁরা এমন এক সম্পর্ককে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করেছেন, যা ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ড যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়নের সেই প্রক্রিয়ার প্রধান মাধ্যম, যার মাধ্যমে ক্রেতা থেকে যৌথ উৎপাদক হয়ে ওঠার এই রূপান্তর পরিচালিত হবে। উভয় সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য হলো মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগের আওতায় যৌথভাবে মানববিহীন ব্যবস্থা এবং অ্যান্টি-ড্রোন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যার লক্ষ্য তৃতীয় দেশের বাজারেও রপ্তানি। এটি ভবিষ্যতের কোনো কল্পনা নয়। বরং ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া এবং তারপর থেকে এই সম্পর্কের প্রতিটি বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অবিচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলা এক যাত্রার স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ।
এই অংশীদারিত্বের সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতার দিকটিও সমান গুরুত্বের দাবিদার। জেরুজালেম শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদী, ভারতের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলের সমর্থনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ধন্যবাদ জানান। এই কৃতজ্ঞতা কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে কয়েক দশকের ধারাবাহিক সহযোগিতার ওপর, যার মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, স্পেশাল ফোর্সেসের যৌথ প্রশিক্ষণ এবং এমন এক হুমকি সম্পর্কে উভয় দেশের অভিন্ন উপলব্ধি, যাকে কোনো দেশই কখনও কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখার বিলাসিতা করতে পারেনি।
কার্গিল বিজয় দিবসের এই বার্ষিকীতে ইতিহাস আমাদের সামনে যে সত্যটি তুলে ধরে, তা স্পষ্টভাবে বলা উচিত। যখন ভারতের এমন এক নির্ভরযোগ্য অংশীদারের প্রয়োজন ছিল, যে নিজের ঝুঁকি হিসাব করবে না বা বাইরের চাপের মুখে নিজের অঙ্গীকারকে পরিমাপ করবে না, তখন ইসরায়েল সেই কয়েকটি দেশের অন্যতম ছিল, যারা ভারতের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল।
সাতাশ বছর পরে, সেই অংশীদারিত্বের কাঠামো আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও শক্তিশালী, আরও সক্ষম এবং আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। টাইগার হিল পুনর্দখলকারী বীর সেনানীদের স্মরণ করার পাশাপাশি, তাঁদের সেই যুদ্ধ যে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই সম্পর্ককেও সমান মর্যাদায় স্মরণ করা উচিত।




