সম্প্রতি ভিবি-জি রামজি প্রকল্পে (পূর্বতন একশো দিনের কাজ) গতি বাড়াতে পঞ্চায়েত পিছু অন্তত কুড়িটি করে প্রকল্প নিতে নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য। কাজ দেওয়ার নিরিখে এই মুহূর্তে শীর্ষে বাঁকুড়া জেলা। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের ২৩টি জেলার ৩৩৩৯টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ২৯৯টিতে ওই প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে। দশ হাজারের বেশি জন শ্রমিক কাজ পেয়েছেন। কাজ দেওয়ার নিরিখে শীর্ষে রয়েছে বাঁকুড়া। জেলার ১৯০টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ৭২টিতে কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ৩৩৮৪ জন শ্রমিক কাজে যুক্ত হয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে বীরভূম ও পুরুলিয়া জেলা। সারা জুড়েই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে তবে কয়েকটি জেলা গোড়া থেকেই খুব ভালো করছে। কাজের গতি বাড়াতে প্রতিটি পঞ্চায়েতকেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু পঞ্চায়েতে ডামাডোল পরিস্থিতিই এখন মাথাব্যথা প্রশাসনের। প্রধানের সই ছাড়া প্রকল্পের কাজ নেওয়া বা শ্রমিকদের মজুরি দিতে বাধা তৈরি হচ্ছে। প্রধানদের রীতিমতো খুঁজে বার করে পঞ্চায়েত অফিসে আনতে হচ্ছে। সমস্যাটি রাজ্যকেও জানানো হয়েছে।
রাজ্য কী নির্দেশ দেয়, সে দিকে তাকিয়ে রয়েছে জেলাগুলি। তবে সামগ্রিক ভাবে বাঁকুড়া জেলার প্রতিটি ব্লকে পঞ্চায়েতভিত্তিক কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ অনেকটা এগিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ২৯২টি নতুন প্রকল্প ভিবি-জি-রামজি প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের নির্দেশমতো প্রতিটি পঞ্চায়েতে কাজের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে এবং সব শ্রমিককেই ওই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা সাজান হচ্ছে। যে সব পঞ্চায়েতে সমস্যা হচ্ছে, সেগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বছর পাঁচেক হল গ্রামীণ মানুষ কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত। দ্রুত সব শ্রমিকদের কাজ দিতে হবে এই দাবি আগেই ঘোষণা হয়েছিল। ১ জুলাই থেকে দেশ জুড়ে চালুও হল বহুচর্চিত ও প্রত্যাশিত কেন্দ্রীয় প্রকল্প, ‘বিকশিত ভারত— গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন গ্রামীণ’ (ভিবি-জি রাম জি)।
আরও ভাল খবর, শুরুর পাঁচ দিনের মাথায় প্রথম কিস্তির টাকাও কেন্দ্র দিয়ে দিয়েছে সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে, পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছে ১২৬৪.৪৯ কোটি টাকা। রাজ্যের অধিকারের টাকা কেন্দ্র ছলে-বলে আটকে রেখেছে, পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমলে এই অভিযোগ লেগেই থাকত; তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার নিজস্ব একশো দিনের কাজ প্রকল্প চালু করেছিল, সেই টাকাও জোগাতে হত নিজস্ব ভাঁড়ার থেকে, অর্থনীতির ছিল লবেজান দশা।
এ বার কেন্দ্র-রাজ্য ডাবল এঞ্জিন সরকারের সুফল, বছরে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা যদি গ্রামবাংলার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অন্তত পান, তা স্বাগত। শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি তিনশো টাকার উপরে ধার্য হয়েছে, প্রকল্পের নিয়মমাফিক তা যাতে প্রথম ১৫ দিনের মধ্যেই তাঁদের হাতে আসে সে কারণেই কেন্দ্র রাজ্যকে প্রথম কিস্তির টাকা পাঠিয়েছে, এই সরকারি তৎপরতা সাধুবাদযোগ্য।
কিন্তু শুধু অর্থপ্রাপ্তিতে কী লাভ, যদি না রাজ্যের পঞ্চায়েত ব্যবস্থাটি এই মুহূর্তে ক্রিয়াশীল, গতিশীল থাকে? পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে বিজেপি নতুন সরকার গড়েছে, রাজ্য জুড়ে ৩৩০০-রও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েতের সিংহভাগ এখনও তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত। এবং জনরোষের ভয়ে প্রায় দু’হাজারের কাছাকাছি তৃণমূল প্রধান-উপপ্রধান অনুপস্থিত, পলাতক, নিখোঁজ— এই হল এই মুহূর্তের বাস্তবতা। এঁরা কাজে না আসায় প্রকল্পের জব কার্ড দেওয়া, কী ধরনের কাজ হবে তা স্পষ্ট করা-সহ গ্রামস্তরে যাবতীয় প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কাজই আটকে আছে, বা বন্ধ। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজনে পুলিশ পাঠিয়ে এই পঞ্চায়েত-প্রতিনিধিদের তুলে নিয়ে আসা হবে, ডিমের জায়গায় ইট ছোড়া হবে। এ কোনও কাজের কথা নয়, সমাধানও হতে পারে না। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা যেখানে প্রশাসনের এক মৌলিক ভিত্তি ও অংশ, তার প্রধান বা প্রতিনিধিদের দেখা দরকার দলীয় নয়, সরকারি পরিচয়ে: তাঁরা কাজে না এলে গ্রামীণ শ্রমিক, মহিলা-সহ নাগরিকদের হাজারো সমস্যার সুরাহা হবে না, বহু প্রকল্প, সিদ্ধান্ত, অর্থসংস্থান আটকে থাকবে— সেই গুরুতর গুরুত্ববিচারে।
উপরন্তু, জনরোষের বিষয়টি সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে যুক্ত— পঞ্চায়েত-প্রধানকে তুলে আনার উদ্দেশ্যে পুলিশকে অস্ত্র না করে উগ্র উন্মত্ত জনতাকে নিবৃত্ত করার কাজে ব্যবহার করা দরকার অবিলম্বে। সেই কাজ হচ্ছে কি? আগে সমস্যা ছিল: টাকা নেই, তাই কাজ হচ্ছে না। এখন টাকা আছে কিন্তু পঞ্চায়েত প্রধান-উপপ্রধান নেই বলে কাজ হচ্ছে না, এ যদি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তবে তা অতি দুর্ভাগ্যের। অর্থবর্ষের বাকি আছে আট মাস, ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকার কাজ এই সময়ের মধ্যে করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই কাজ সম্পন্ন হওয়ার গোড়ার শর্ত পঞ্চায়েত প্রধান-উপপ্রধানদের উপস্থিতি। তাঁদের সক্রিয়তায় গ্রামসভার কাজ ঠিক করে না হলে আখেরে সব মাটি হবে। কোনও রাজনীতিক বা ব্যক্তির জন্যই সরকারি পরিষেবা দেওয়ার কাজ থেমে থাকবে না— মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই কথার সূত্র ধরেই বলা চলে, সরকারি পরিষেবা ও নাগরিক অধিকার নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিরোধী দলপরিচয়ের জনপ্রতিনিধির কাজ করার সুষ্ঠু পরিবেশও নিশ্চিত করা জরুরি।
আগের সরকার এ ক্ষেত্রে কী করেছে, তার সময় এই পরিবেশ কেমন ছিল, এখনকার সরকারের কাজ বা মনোভাবে তার প্রতিফলন বা প্রতিশোধ কাম্য নয়। মুখ্যমন্ত্রী যেমন তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদেরও মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দলের পঞ্চায়েত প্রধানও তেমনই সব পঞ্চায়েতবাসীর প্রতিনিধি। দল-নির্বিশেষে এই গণতান্ত্রিক পরিসরটি রক্ষিত হলে সরকারের কাজও সফল হবে।




