সদ্য বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। এখনো তার রেশ কাটেনি। তাই শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডার্বির মধ্যেও অনেকে বিশ্বকাপের ছায়া দেখতে চায়। ফাইনালে যে ভাবে আর্জেন্টিনাকে কার্যত দাঁড় করিয়ে রেখে হারিয়ে দিয়েছিল স্পেন, সেই খেলা বেশ পছন্দ হয়েছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের গ্রিক কোচ প্যানাগিওতিস দিলম্পেরিসের, যাঁর ডাক নাম প্যানোস। শনিবার সন্ধ্যায় যুবভারতীতে দলের কাছ থেকে সেরকমই খেলা চান তিনি। কিন্তু বার এও বলছেন, মাত্র তিন দিন অনুশীলন করে এত ভালো ফুটবল খেলা কঠিন।
মরসুমের প্রথম ডার্বির ২৪ ঘণ্টা আগে সাংবাদিকদের মোহনবাগান জানিয়ে দিলেন, ‘আমরাও বল পায়ে রাখারই চেষ্টা করব। বল যত পায়ে রাখতে পারব, ততই প্রতিপক্ষকে গোল থেকে দূরে রাখা যাবে। তবে আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণও ভালো করতে হবে আমাদের। এটাই তো সবচেয়ে ভালো ফুটবল’।
তাঁর ফুটবল দর্শনও যে স্পেনের ফুটবলের মতোই, তা জানিয়ে দেন সবুজ-মেরুন কোচ। বলেন, ‘আমার ফুটবল দর্শন আধুনিক ফুটবলের দর্শনের মতোই। আমি বল দখলে রাখতে পছন্দ করি। আক্রমণাত্মক ফুটবল পছন্দ করি। বল কেড়ে নিয়ে ডিফেন্স থেকে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠা পছন্দ করি। রক্ষণ সামলে দ্রুত আক্রমণে উঠে কাজ শেষ করে আসাই আমার দলের লক্ষ্য হতে চলেছে’।
কিন্তু এই খেলা নিখুঁত ভাবে খেলতে হলে যে দল নিয়ে আরো অনেক অনুশীলন করতে হবে তাঁকে, তা খুব ভাল করেই জানেন গ্রিক কোচ। বলেন, ‘এ সব তিন দিনের অনুশীলনে হওয়া সম্ভব না। আমাদের আরো প্র্যাকটিস করতে হবে। কালকের ম্যাচে এর কিছু অংশ হয়তো আপনারা দেখতে পাবেন। কিন্তু দলের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সব কিছু এত তাড়াতাড়ি চাইলে হবে না। ওরা সবে একসঙ্গে অনুশীলন শুরু করেছে। ওদের সময় দিতে হবে’।
মরসুমের শুরুটাই হচ্ছে ডার্বি দিয়ে, এটা খেলোয়াড়, কোচ দু’পক্ষের কাছেই বেশ কঠিন। এখনো এক সপ্তাহও হয়নি একসঙ্গে অনুশীলন করছে তারা। শুরুতেই ডার্বিতে নামতে হচ্ছে। তবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, জানিয়ে দিলেন মোহনবাগান কোচ।
বলেন, ‘মরসুমের শুরুতেই ডার্বি, তাই চ্যালেঞ্জটা কঠিন। কিন্তু আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। দলে অনেক খেলোয়াড়ই এখনো পুরো ম্যাচ খেলার অবস্থায় নেই। অনেক কিছুর সঙ্গেই এখনো তারা পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। কিন্তু যেহেতু ম্যাচটা আমাদের খেলতে হবে, তাই দলের খেলোয়াড়দের যথাসাধ্য তৈরি করতে হবে। আমার দলের অবস্থা যথেষ্ট ভাল। ছেলেরা দ্রুত সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, আমি যা চাইছি তা করার চেষ্টা করছে। কাল আমরা চেষ্টা করব ভাল ফুটবল খেলতে এবং বল যথাসম্ভব নিজেদের পায়ে রেখে ম্যাচটা জিততে’।
তবে ডার্বি নিয়ে বেশ রোমাঞ্চিত দিলম্পেরিস। বলেন, ‘সারা বিশ্বে ডার্বিগুলোই তো ফুটবলের প্রধান আকর্ষণ। ডার্বির মতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই না হলে ফুটবলের কোনো আকর্ষণ থাকে না। আমি খুবই রোমাঞ্চিত এমন একটা ম্যাচ দিয়ে মরশুম শুরু করার সুযোগ পেয়ে’।
বিপক্ষে ডার্বি-অভিজ্ঞ হাবাস, বাড়তি চাপ?

মোহনবাগানের প্রাক্তন কোচ ও একাধিক ডার্বির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তোনিও লোপেস হাবাসের দলের বিরুদ্ধে খেলা নিয়ে তাঁর খুব একটা মাথাব্যথা নেই। পাঁচটি ডার্বিতে দল নামানো হাবাসকে নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে প্যানোস বলেন, ‘এখন আমি আমার দলেই বেশি ফোকাস করছি। চারপাশে অন্য কোথাও ফুটবলে কী হচ্ছে, সে সব নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। ফুটবল ১১ বনাম ১১-র খেলা, যা ১০ মিটার বাই ১৭ মিটার বক্সের মধ্যে হয়। এর জন্যই আমি আমার খেলোয়াড়দের নিয়ে পরিশ্রম করি। বাকি আর কোনো কিছু নিয়েই আমি মাথা ঘামাই না। নিজেকে সব সময় প্রতিপক্ষের কোচের জায়গায় নিয়ে গিয়ে ভাবি, মোহনবাগানের কোন মুভকে আটকাতে ওরা কী করতে পারে, তা আমি আগে থেকে ভেবে নিই। এটাই আমার প্রক্রিয়া’।
ডার্বি কতটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে কোচ বলেন, ‘আমার কাছে সব ম্যাচই ডার্বি। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে খারাপ দলের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগের রাতেও আমি যতটা ঘুমোই, ডার্বির আগের রাতেও ততটাই ঘুমোব। জন্ম থেকে ফুটবলই আমার জীবন। মোহনবাগানের কাছে এটা একটা বিশাল ম্যাচ হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে আর পাঁচটা ম্যাচের মতোই’।
ডার্বির জন্য দলের প্রস্তুতি নিয়ে প্যানোস বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি ভালোই হয়েছে। আমার কোনো খেলোয়াড়ের কোনো চোট নেই। দেজান গোটা দুয়েক প্র্যাকটিস সেশনের পরে এখানে উপভোগ করতে শুরু করেছে। কাল আমরা জিততেই নামব। সকালে খেলোয়াড়দের অবস্থা দেখে প্রথম এগারো ঠিক করব। তার আগে নয়। আমার খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। ওরা জানে এই অবস্থায় কী করা উচিত। আমার বিশ্বাস, আমার দল যে কোনো দলকে হারাতে পারে’।
ভারতীয়দের নিয়েই লড়াই
দেজান দ্রাজিচ ছাড়া শনিবার আর কোনো বিদেশিকে পাওয়ার সম্ভাবনা কম প্যানোসের। স্প্যানিশ ডিফেন্ডার আলবার্তো রদ্রিগে শুক্রবারই এসে পৌঁছন। তবে কোচ ভারতীয় খেলোয়াড়দের ওপরই আস্থা রাখছেন। বলেন, ‘আমাদের দলে ভারতের সেরা ফুটবলাররা রয়েছে। বিদেশিরাও ভাল। আমাদের দলে যারা রয়েছে, তাদের দেখে একজন কোচ যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে। আমার গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ভারতীয় খেলোয়াড়রা কোচেদের খুবই শ্রদ্ধা করে, ওরা অনেক কিছু শিখতে চায় এবং যা ওদের শেখানো হয়, ওরা মন দিয়ে শেখে। সব কিছুর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাই ওদের নিয়ে লড়াই করতে আমার কোনো অসুবিধা হবে না’।
শনিবার যে যুবভারতীর গ্যালারিতে ৫০-৬০ হাজার দর্শক হবে, তা জানেন মোহনবাগান এসজি-র কোচ। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কোনোদিন ৫০-৬০ হাজার দর্শকের সামনে দল নামিয়েছি বলে মনে পড়ে না। তবে আমি কখনও মাঠে নেমে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দেখিনা সেখানে কত দর্শক আছে। প্রতিপক্ষে কারা খেলছে, তাও দেখি না। বাইরের কোনো বিষয়ের চাপ আমি ড্রেসিংরুমে ঢুকতে দিই না। তবে এটা অবশ্যই একটা মোটিভেশন। ভরা গ্যালারির সামনে একটা ফুটবল ম্যাচ হলে, এর চেয়ে ভালো আর কিই বা হতে পারে?’




