বাংলার উন্নয়নে নবগঠিত সরকার বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। শুরুতে উত্তরবঙ্গের জন্য আইআইটি ইত্যাদির ঘোষণা শোনা গেলেও, আপাতত সেই কলকাতার আশেপাশেই কর্মকাণ্ডের সূচনা দেখা যাচ্ছে। বোধকরি এই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য খাস কলকাতা নয়, বাদ-বাংলার সন্তান। সে হিসাবে আমাদের আশা, এবার বুঝি কলকাতাকেন্দ্রিক উন্নয়নের বদলে পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক উন্নয়ন হবে। সেই কবে রবিকবি জানিয়ে গেছিলেন, দেহের সব রক্ত মুখে এসে জমা হলে তাকে স্বাস্থ্যের লক্ষণ বলে না। পুরুলিয়া, দিনাজপুর বা কোচবিহার পিছনে পড়ে থাকলে বাকি পশ্চিমবঙ্গ এগোতে পারে না, কলকাতাকে পিছন থেকে টানবেই পশ্চাদবর্তী অবহেলিত জেলাগুলি। অথচ, আজও উত্তরবঙ্গে বলার মতো মেডিক্যাল কলেজ বলতে ওই এক উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ! রায়গঞ্জে প্রস্তাবিত এইমস ডাকাতি করে টেনে আনা হয়েছে কলকাতার উপকণ্ঠে! সেই আপ শান্তিনিকেতন, ডাউন শান্তিনিকেতন উপসর্গ। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ সম্বন্ধে ওরকম শোনা যেত। অধ্যাপকরা কলকাতা থেকে আপ শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরে এসে বর্ধমানে নেমে ক’টি ক্লাস নিয়ে আবার ডাউন শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরে ফিরে যেতেন মহানগরীর সুখের নীড়ে! সেই আমলে বাংলার সেরা চারটি মেডিক্যাল কলেজই ছিল কলকাতায়, রাঢ়বঙ্গের জন্য দুটি, উত্তরবঙ্গের জন্য সবেধন নীলমণি একটি! এমনকি, একমাত্র ডেন্টাল কলেজটিও কলকাতায়। বাঁকুড়ার কলেজটি আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বলে সেখান থেকে পাশ করা ডাক্তাররা জাঁক করে নিজেদের এমবিবিএস ডিগ্রির পাশে ক্যাল কথাটি লিখে বর্ধমান বা উত্তরবঙ্গীয়দের পিছনে ফেলতেন! তখন হুগলি জেলা থেকে জাঁদরেল সব বাম নেতা, মন্ত্রীরা থাকলেও গোটা জেলায় একটিও আইসিইউ বেড ছিল না! আজও, জেলার সদর শহর চুঁচুড়ায়, যা কিনা তৎকালীন বর্ধমান ডিভিশনেরও সদর শহর ছিল, নেই কোনও মেডিক্যাল কলেজ! দস্তুর এই, কলকাতা কাছে, অতএব, বাকি বাংলার মানুষ যেমন রোগে-অসুখে ঘটিবাটি বেচে এসে প্রাণত্যাগ করবে ইএম বাইপাসের পাশের ডাকাতিয়া বেসরকারি বা কলকাতার সরকারি হাসপাতালে, সাম্যবাদের পরাকাষ্ঠা রেখে হুগলি জেলাবাসীও তাই করবে। হায়! গঙ্গার পশ্চিম কূল বারাণসী সমতুল,
অথচ, তাবৎ বাঙালির প্রাণত্যাগ ব্যাসকাশীর
মতো গঙ্গার পুব কূলে!
স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে দু’কথা বলতে হল, প্রথম কারণ, এখনও অনেক কাজ বাকি। দুই, রাজ্যব্যাপী অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থার দরুনই কৃষক ও কৃষির সর্বনাশ ঘটে যাচ্ছে, মার খাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। ভূমিসংস্কারের ফল হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের জোতের মাপ ছোট ছোট। তায়, কৃষিব্যবস্থা মোটের উপর যাকে বলে খেয়ে পরে দিন গুজরান করার মতো। কৃষকের কাছে যথেষ্ট আয় বা সঞ্চয় হওয়ার সুযোগ নেই। এমন অবস্থায় পরিবারের কোনও সদস্যর যদি বড় কোনও রোগ বা দীর্ঘমেয়াদী অসুখ হয়, সঞ্চয় ভেঙে কলকাতার ফুটপাথ বা বস্তিবাসী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই! আগে, খরা, বন্যা বা দুর্ভিক্ষ হলে দলে দলে লোক দেশান্তরী হতো। এখন, প্রধান কারণ দাঁড়িয়েছে দেনা, যার আবার প্রধান কারণ চিকিৎসার ভারী খরচ। আশা করি, বাংলার কৃষির উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনার প্রথমেই গ্রাম ও মফস্বল বাংলার চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি রাখা হবে।
এখন, কেউ কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, কৃষির উন্নয়নের কথা এত উঠছে কেন, আইটি বা ভারী শিল্পর দিকে মনোযোগ দিলেই তো হল, বিশেষত যখন দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র সতেরো শতাংশর মত। ঘটনা এই, জিডিপিতে অবদান যতই কম হোক, এখনও কৃষিতেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক নিয়োজিত। কৃষির উন্নয়ন ব্যতীত, তাদের উন্নতি নেই। তার উপর, বহু শিল্পের কাঁচামাল যোগায় কৃষি, সুতরাং, উন্নত কৃষি ছাড়া তাদের উন্নয়ন সুদূরপরাহত ব্যাপার। আরেকটা জরুরি ব্যাপার হল, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কাজকর্ম যথা পশুপালন বা মৎস্যচাষ এবং কৃষিনির্ভর উদ্যোগ অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান করতে পারে, যা ভারী শিল্প বা পরিষেবা শিল্পের কাছেও আশা করা যায় না। জবলেস গ্রোথ কি আমাদের দরকার আছে?
বোঝার সুবিধার জন্য উদাহরণ, ভারত সরকারের প্রোডাকশন লিঙ্কড ইন্সেন্টিভ স্কিমের সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য থেকে পরিষ্কার, যাবতীয় সেক্টরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান করেছে ফুড প্রোডাক্টস। ফুড প্রোডাক্টস সেক্টরে নয় হাজার দুশো কোটি টাকার বিনিয়োগে প্রত্যক্ষ চাকরি হয়েছে তিন লাখ উনত্রিশ হাজার লোকের। তুলনায়, হোয়াইট গুডস যথা ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন তৈরিতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে বাহান্ন হাজার সাতশো লোকের। লার্জ স্কেল ইলেক্ট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রধানত স্মার্টফোন তৈরিতে বিশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে কর্মসংস্থান হয়েছে ফুড প্রোডাক্টসের প্রায় অর্ধেক, এক লাখ সত্তর হাজারটি। হাই এফিসিয়েন্সি সোলার পিভি সেল তৈরি বা স্পেশালিটি স্টিল তৈরিতে যথাক্রমে প্রায় পঁয়ষট্টি হাজার ও চব্বিশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও, দুই সেক্টরেই প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র চৌদ্দ হাজার করে! বোঝা যাচ্ছে, এই দুই সেক্টরই অত্যন্ত দামী ক্যাপিটাল গুডস ও অটোমেশন নির্ভর। এখানে জনবহুল ও বেকারত্বপীড়িত পশ্চিমবঙ্গের জন্য কোন সেক্টর বেশি গুরুত্বপূর্ণ বোঝা শক্ত কি?
সেই বিচারে, হাওড়ার সাঁকরাইলে সদ্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল যার, সেই প্রস্তাবিত আমূল কোম্পানির দই উৎপাদন কারখানা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। শোনা যাচ্ছে, দৈনিক ত্রিশ লাখ লিটার দুধের প্রক্রিয়াকরণ করে প্রায় হাজার টন দই ও অন্য কালচার উৎপাদিত হবে এবং এর ফলে লাভবান হবে প্রায় সোয়া লাখ কৃষক, যার মধ্যে প্রায় ত্রিশ হাজার হবেন মহিলা। পুরনো পাঠকরা জানেন, এই অধম বহুদিন ধরেই বাংলার পশ্চিমভাগে, রাঢ়বঙ্গের জন্য গুজরাত মডেলের সুপারিশ করে আসছে। একটি আমূল কেন গড়ে তোলা যায়নি পশ্চিমবঙ্গে, এই প্রশ্নও বার বার করা হয়েছে। অথচ, এই সমবায় প্রথা তো বাংলাই বাকি ভারতকে শিখিয়েছে! আজ্ঞে, সেই বাংলার প্রাণের ঠাকুরের শ্রীনিকেতন মডেল হল আদর্শ। দু:খের কথা, বিলাসনগরী ছেড়ে তিনি রাঢ়বাংলার বুকে জীবনের দুটি সাধনার একটি, শ্রীনিকেতন গড়ে তুললেও, বিলাসী বাঙালি তাঁর গান ড্রয়িংরুমে, সিনেমায় আর রবীন্দ্রসদনে গেয়েই দিন কাটাল এবে পান খেয়ে, কবিপুত্রের মত পতিসরে ট্র্যাক্টরও চালাল না, নোবেলজয়ী সেনের আচার্য মাতামহের মতো হলকর্ষণের হালও ধরল না! আজ্ঞে না, সত্যি ধরার কথা বলছি না, ওতে হিম্মত লাগে। কিন্তু, একটি কৃষি উদ্যোগ গড়ে তোলা, কৃষি বিপণনে বা কমোডিটি ট্রেডিং-এ হাত পাকানো গেল না? নিদেনপক্ষে পৈতৃক জমিতে শখের চাষ, ফার্মহাউস? অপারেশন বর্গার দোহাই দিয়ে জমি, সাতপুরুষের ভিটে বেচেবুচে কলকেতার উপকণ্ঠে একটি ফ্ল্যাট বাগিয়ে প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন? আশা করব, নতুন সরকার এই আমোদপ্রমোদবিলাসী বাঙালিদের জন্য ভাবার আগে, উত্তরবঙ্গের চা বাগান থেকে শুরু
করে মধ্যবঙ্গের পাটচাষি হয়ে দক্ষিণবঙ্গের মৎস্যচাষিদের জন্য কিছু করবেন, তাতে, বাঙালির ভাগ্যবিধাতা সন্তুষ্ট হবেন।




