অনেকের মনে এখন একটাই প্রশ্ন তবে কি ছন্দে ফিরলো ভারতের শেয়ার বাজার? উত্তরে বলা যায়, এই মুহূর্তেই বলার সময় হয়নি, তবে বাজারের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী বাজার ফিরে পেয়েছে তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস। এই সপ্তাহে ও নিফটি ছাড়িয়ে গেছে ২৪৩০০-এর ঘর। টেকনিক্যাল অ্যানালিস্টদের মতে ২৪ হাজার ৪০০ এখন দেখার বিষয়। এই বাধা অতিক্রম করতে পারলে বাজার আরও কিছুটা উপরে যাবে। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি কিছুই হয়নি। দুই দেশ যুদ্ধের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালীর উপর কর্তৃত্ব নিয়ে এখন তাল ঠোকাঠুকি চলছে ইরান এবং আমেরিকার। ফলে আকাশ ছুঁয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। গত সপ্তাহে সাপ্তাহিক বন্ধের ভিত্তিতে ব্যারেল পিছু ও অপরিশোধিত তেলের ৮৮ ডলার, যা গত সপ্তাহ থেকে অনেকটা উপরে। অপরিশোধিত তেলের দামের এই উত্থানের ফলে চিন্তার ছায়া পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। শুধু তাই নয় দেশের অর্থনীতিতেও মুদ্রাস্ফীতির কালো ছায়া প্রসারিত হয়েছে। গত সপ্তাহে সিপিআই (কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স) বেড়ে এসেছে অনেকটা। সেই সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়া কতটা চরম হবে সে ব্যাপারে সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়াবিদরা। ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির রক্তচক্ষুকে বর্তমানে এড়িয়ে যাওয়া বেশ দুষ্কর। মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির যাঁতাকলে পড়ে কাটতে পারে বাজারের স্বাভাবিক ছন্দ, এই প্রশ্ন বর্তমানে বিনিয়োগকারীর মনে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নিফটি এবং সেনসেক্স সামান্য কিছুটা বাড়লেও মিডক্যাপ এবং স্মল ক্যাপের সূচক সাপ্তাহিক বন্ধের ভিত্তিতে ছিল একটু নিচে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারের পারফরম্যান্সের দিক থেকে দেখতে গেলে আমাদের বাজারের পারফরমেন্স বেশ ভালো।
DOWJONES, S&P ৫০০, এবং NASDAQ অর্থাৎ আমেরিকার প্রধান সূচকগুলি বেশ কিছুটা নিচে বন্ধ হয়েছে গত সপ্তাহে। সমগ্র ইউরোপ থেকে বাজার সেভাবে ভালো সাড়া পায়নি। গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার সূচক প্রায় ৬ শতাংশ নিচে বন্ধ হয়েছে। তাদের আনা Leverage ETF-এ হাত পুড়িয়েছে অনেক ছোটখাটো বিনিয়োগকারী। সব থেকে খারাপ অবস্থা জাপানের সুচকের যা প্রায় গত সপ্তাহে প্রায় ৬ শতাংশ নিচে বন্ধ হয়েছে। হংকংয়ের সূচক কিন্তু হেটেছে সম্পূর্ণ অন্য পথে, যা প্রায় সাপ্তাহিক বন্ধের ভিত্তিতে ১.৫% উপরে বন্ধ হয়েছে। গত সপ্তাহে সেক্টোরিয়াল সূচকগুলির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরের সূচকের উত্থান ছিলো চোখে পড়ার মতো, যা প্রায় ৪ শতাংশ উপরের গত সপ্তাহে বন্ধ হয়েছে। পিছিয়ে নেই মিডিয়া, পিএসইউ ব্যাঙ্ক, ফার্মা এবং এনার্জি সেক্টরের সূচক। রিয়ালিটি, মেটাল, এফএমসিজির সূচক প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ বিনিয়োগকারীর। গত সপ্তাহে INDIAVIX-এর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, যা প্রায়
৬ শতাংশ উপরে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনে বাজার হতে পারে যথেষ্ট ভোলাটাইল। ফলে এই ব্যাপারে বিনিয়োগকারীকে থাকতে হবে সদা সতর্ক। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা গত সপ্তাহে প্রায় ৯১০০ কোটি টাকার মত শেয়ার বিক্রি করেছে ভারতের বাজার থেকে। অবশ্য এফপিআই (ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট)-এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশ কিছু টাকার শেয়ার কিনেছেন ভারতের শেয়ার বাজার থেকে। ভারতের অর্থনীতির ওপর ভরসা রেখেছে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা, তারা প্রায় গত সপ্তাহে ৯৮০০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন বাজার থেকে। সোনা এবং রুপো এই দুই মূল্যবান ধাতুর দাম গত সপ্তাহে সাপ্তাহিক বন্ধের ভিত্তিতে একটু নিচে বন্ধ হয়েছে। এই কোয়ার্টারে অর্থনৈতিক ফলাফল ভালো হবে এই আশায় বুক বেঁধেছে অনেক বিনিয়োগকারী। অবশ্য যে সমস্ত কোম্পানির ফলাফল আসতে শুরু করেছে তারা বিনিয়োগকারীকে খুব বেশি নিরাশ করেনি।
তেলের দাম বাড়তে থাকলে অস্থির হবে ভারতের শেয়ার বাজার। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মত হাইব্রিড ফান্ড। নিজের রিক্স প্রফাইল অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। রিস্ক প্রোফাইল সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে সাহায্য নিন বিশেষজ্ঞদের। অযথা বেশি ঝুঁকি নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ না করাই সবচেয়ে শ্রেয়। অনেক বিনিয়োগকারী আবার DERIVATIVES-এর মাধ্যমে বাজারে ট্রেডিং করতে চান। এ ব্যাপারে যথাযথ জ্ঞান বিনিয়োগকারী না থাকলে বা এর প্রায়োগিক দিক ভুল হয়ে গেলে সেই ভুলের মাশুল অনেক বড় ভাবে বিনিয়োগকারীকে দিতে হয়। সুতরাং বাজার সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এর মাধ্যমে বাজারে ট্রেডিং না করাই যুক্তিযুক্ত। মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগ করতে চাইলে এই পরিপ্রেক্ষিতে হাইব্রিড ইকুইটি ফান্ড এবং মাল্টি অ্যাসেট ফান্ডগুলোর দিকে নজর দেওয়াটা জরুরী। আর অবশ্যই এসআইপিকে (সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান) কাজে লাগাবেন নিজের ভবিষ্যতের পাথেয় হিসাবে।




