• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 17 July, 2026

Explained: কারও পদত্যাগপত্র নেওয়া হবে না: কড়া ফতোয়া কেন্দ্রের, বিজ্ঞানীদের ইসরো ছাড়ার হিড়িক কেন?

শতাধিক বিজ্ঞানীর ইস্তফায় গগনযান প্রকল্প নিয়ে সংশয়। ইসরোয় পদত্যাগের নিয়মে কড়াকড়ি কেন্দ্রের। রয়েছে বাংলার বিজ্ঞানীদের যোগসূত্রও।

Explained: কারও পদত্যাগপত্র নেওয়া হবে না: কড়া ফতোয়া কেন্দ্রের, বিজ্ঞানীদের ইসরো ছাড়ার হিড়িক কেন?

সংকটে ISRO (AI নির্মাণ)

মহাকাশ গবেষণায় ভারতের গর্বের প্রতিষ্ঠান, অথচ সেই ইসরোর (Indian Space Research Organisation) অন্দরেই এখন অস্বস্তির ঘনঘটা। একশোরও বেশি বিজ্ঞানী চাকরি ছাড়ছেন, তার জেরে এবার নড়েচড়ে বসল কেন্দ্র। পদত্যাগ ও স্বেচ্ছাবসরের আবেদনে লাগাম টানল ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস (Department of Space, সংক্ষেপে DoS)। বিশেষত যাঁরা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ প্রকল্প গগনযানের (Gaganyaan) সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের ছাড়পত্র এখন থেকে মিলবে না।

হঠাৎ কী ঘটল ইসরোয়?

গত ১৪ জুলাই ইসরোর প্রধান কেন্দ্রগুলিতে একটি অভ্যন্তরীণ মেমোরান্ডাম পাঠানো হয়েছে। যে কেন্দ্রগুলির মধ্যে রয়েছে বেঙ্গালুরুর ইউআর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার (URSC) এবং তিরুবনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টারও (VSSC)। নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, গ্রুপ ‘এ’ পদমর্যাদার বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে সাম্প্রতিক কালে পদত্যাগ ও স্বেচ্ছাবসরের (Voluntary Retirement Scheme বা VRS) আবেদনের হিড়িক পড়ে গিয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পগুলিতে।

ফলে সিদ্ধান্ত, গগনযান বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন আর গ্রহণ করা হবে না। প্রতিটি কেন্দ্রের অধিকর্তাকে সেই আবেদন সুপারিশ সমেত পাঠাতে হবে দিল্লির ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেসে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য। এর ফলে কার্যত উলটে গেল ২০২০ সালের নভেম্বরের একটি সংস্কার, যাতে কেন্দ্র অধিকর্তারা নিজেরাই সায়েন্টিস্ট বা ইঞ্জিনিয়ার-এসজি (Scientist/Engineer-SG) স্তর পর্যন্ত পদত্যাগ মঞ্জুর করার ক্ষমতা পেয়েছিলেন।

কতজন ছাড়লেন, কারা ছাড়লেন?

সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, গত কয়েক মাসে ইসরো ছেড়েছেন ১০০ থেকে ১২০ জন বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ। এর মধ্যে প্রায় ৮০ জন কেবলমাত্র ইউআর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার থেকে, বাকিরা মূলত বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার থেকে। তালিকায় নাম রয়েছে এলভিএম-৩ (LVM3) লঞ্চ ভেহিকল প্রকল্পের প্রজেক্ট ডিরেক্টর বিক্টর জোসেফের, দেশের প্রথম মহাকাশ ডকিং মিশন স্প্যাডেক্সের (SpaDeX) প্রজেক্ট ডিরেক্টরের এবং চন্দ্রযান-৩ মিশনের সিমুলেশন প্রজেক্ট ম্যানেজার আদিত্য রল্লাপল্লির, যিনি চন্দ্রযানের চন্দ্র-অবতরণ পর্ব লক্ষাধিক বার সিমুলেট করে যাচাই করেছিলেন। এমনকি ইসরোর প্রাক্তন প্রধান এস সোমনাথও অবসরের পরে যোগ দিয়েছেন বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা অগ্নিকুল কসমসে (Agnikul Cosmos), যা এই প্রবণতার প্রতীকী উদাহরণ হয়েই থেকে গিয়েছে।

কেন হঠাৎ এই পদত্যাগের স্রোত?

সরকারি ভাবে ইসরো বা ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস এখনও এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি। তবে শিল্পমহলের ব্যাখ্যা মোটের উপর এক জায়গায় গিয়ে মিলছে। ২০২০ সালে মহাকাশ ক্ষেত্র বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দেওয়ার পরে দেশে দ্রুত বেড়ে উঠেছে একঝাঁক স্টার্টআপ, যেমন স্কাইরুট অ্যারোস্পেস (Skyroot Aerospace), অগ্নিকুল কসমস, পিক্সেল (Pixxel), বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেস, ধ্রুব স্পেস এবং দিগন্তরা। এই সংস্থাগুলি অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের টানছে অনেক বেশি বেতন, স্টক অপশন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং নেতৃত্বের সুযোগ দিয়ে। উলটো দিকে সরকারি বেতনকাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ধীরগতির পদোন্নতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বলে রাখা ভালো, ইসরো থেকে এমন গণহারে কর্মী চলে যাওয়া নতুন ঘটনা নয়। ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন সংস্থা ছেড়েছেন বলে পরিসংখ্যান বলছে। তবে এ বার প্রশ্নের মুখে সরাসরি গগনযানের মতো সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রকল্প, সেখানেই উদ্বেগ কেন্দ্রের।

বাংলার সঙ্গে যোগ?

ইসরোর সাফল্যের সঙ্গে বাংলার নামও কম জড়িয়ে নেই। চন্দ্রযান-৩ মিশনের দলে বাংলা থেকে পড়াশোনা করা অন্তত ৩১ জন বিজ্ঞানীর নাম উঠে এসেছিল, যাঁদের মধ্যে ছিলেন আইআইটি খড়্গপুর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা কলকাতার বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রাক্তনীরা। নদিয়ার বাসিন্দা বরুণ বিশ্বাস আদিত্য-এল১ (Aditya-L1) সৌর মিশনে রকেট ট্র্যাকিংয়ের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন। এমনকি ইসরোর বর্তমান চেয়ারম্যান ভি নারায়ণনও এমটেক ও পিএইচডি করেছেন আইআইটি খড়্গপুর থেকেই। প্রতি বছর শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারে আয়োজিত ইসরোর ইয়ং সায়েন্টিস্ট প্রোগ্রামেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গড়ে দশ জন পড়ুয়া সুযোগ পান, যা রাজ্যের তরুণ প্রতিভাদের কাছে একরকম স্বপ্নের সিঁড়ি।

তাই ইসরোর অন্দরের এই অস্থিরতা নেহাত দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর সীমানায় আটকে থাকার বিষয় নয়। যে রাজ্যের ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর জাতীয় মহাকাশ কর্মসূচিতে মেধা জুগিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের কাছেও প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

এর পরে কী?

বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, শুধু পদত্যাগের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে কি না। বেতন কাঠামো সংস্কার বা কেরিয়ারে উন্নতির সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ, জোর করে আটকে রাখা কোনও প্রতিভাবানই দীর্ঘমেয়াদে সংস্থার পক্ষে লাভদায়ক বা সুফলদায়ক হন না।