• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 14 July, 2026

উত্তপ্ত পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সেনার গুলি, নিহত কমপক্ষে ৬: সিন্ধু পারে ভয়ঙ্কর সংকট

পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভকারীদের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ছয়জনের মৃত্যু। জাক আন্দোলনের দাবি, প্রশাসনের দমনপীড়ন এবং আগামী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে গোটা সংকট বিশদে জানুন।

উত্তপ্ত পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সেনার গুলি, নিহত কমপক্ষে ৬: সিন্ধু পারে ভয়ঙ্কর সংকট

উত্তপ্ত পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (Source-X)

সিন্ধু পারে ঘনীভূত সংকট। ফের রক্তাক্ত হল পাক অধিকৃত কাশ্মীর (Pakistan-occupied Kashmir বা PoK)। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালায়। গুলিতে অন্তত ৬ সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর খবর মিলেছে। গত দেড় মাস ধরে এই অঞ্চল জুড়ে চলা অসন্তোষের আগুন কার্যত নেভার নাম নিচ্ছে না, বরং প্রতি সপ্তাহেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

কেন এত অশান্তি

এই আন্দোলনের সূচনা মূলত বিদ্যুতের চড়া মাশুল, ভর্তুকিযুক্ত আটার আকাল এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে ক্ষোভ থেকে। এই ক্ষোভকে সংগঠিত রূপ দিয়েছে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (Joint Awami Action Committee বা JAAC), যা ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও পড়ুয়াদের নিয়ে তৈরি একটি সংযুক্ত সংগঠন। তাদের ৩৮ দফা দাবিপত্রে রয়েছে বিদ্যুতের দাম কমানো, স্থানীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রাজস্বে ন্যায্য অংশীদারি এবং আইনসভায় পাকিস্তানে বসবাসকারী উদ্বাস্তু কাশ্মীরিদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের মতো বিষয়।

দমনপীড়নের শুরু

জুন মাসের গোড়ায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের প্রশাসন সন্ত্রাসদমন আইনে (Anti-Terrorism Act) জাক-কে (JAAC) নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তাদের দপ্তর সিল করে দেওয়া হয় এবং শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এরপরই রাওয়ালকোটে বারমাং সেতুর কাছে এক আন্দোলনকারীর গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা গোটা এলাকাকে উত্তপ্ত করে তোলে। জুনের শুরুতেই রাওয়ালকোটে সংঘর্ষে অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর মেলে, যদিও রয়টার্স, ডন এবং স্থানীয় সংগঠনগুলির দেওয়া সংখ্যায় ফারাক ছিল। এরপর জুনের মাঝামাঝি ইদগাহ ময়দানে বিশাল জমায়েতে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে পাকিস্তানি সেনা ও রেঞ্জার্সের বিরুদ্ধে, যাতে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়

জুলাইয়ে ফের নতুন সংঘর্ষ

জুলাইয়ের শুরুতে ছ’শোরও বেশি মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেপ্তারির পর ফের বড় আকারে বিক্ষোভ শুরু হয় গোটা অঞ্চল জুড়ে। মুজফফরাবাদ, মিরপুর, রাওয়ালকোট সমেত একাধিক জায়গায় প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদীদের দাবি, নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে। যদিও পাকিস্তানি প্রশাসনের বক্তব্য, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি প্রথমে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালানোয় পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। দুই পক্ষের দাবিই এখনও পুরোপুরি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, কারণ ঘটনাস্থলে ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (Amnesty International) মতো মানবাধিকার সংগঠন ইতিমধ্যেই পাকিস্তানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনের অভিযোগ তুলেছে। ব্রিটেনের একাধিক সাংসদ এই ইস্যুতে নিজেদের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে চিঠি লিখেছেন। প্রবাসী কাশ্মীরিরা লন্ডন, ম্যাঞ্চেস্টার, অকল্যান্ডের মতো শহরে পথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও এই ঘটনাক্রমে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টির উপর আন্তর্জাতিক নজরদারির আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলার প্রেক্ষাপটে কেন গুরুত্বপূর্ণ

সীমান্তরেখার (Line of Control বা LoC) ওপারের এই সংকট সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে জড়িত না হলেও, উদ্বাস্তু সংকট ও বলপূর্বক বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা এই রাজ্যের কাছে একেবারেই অচেনা নয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় বাংলাই দেখেছিল কীভাবে রাজনৈতিক সীমারেখা মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও পরিচয়কে তছনছ করে দিতে পারে। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের আজকের লড়াই, ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি, তাই ঐতিহাসিকভাবে বাংলার নিজস্ব দেশভাগ-স্মৃতির সঙ্গে একটি আবেগঘন সাযুজ্য তৈরি করে, যদিও দু’টি ঘটনার রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আগামী দিনে কী হতে পারে

পাক অধিকৃত কাশ্মীরে আগামী ২৭ জুলাই আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ১২টি সংরক্ষিত উদ্বাস্তু আসনের প্রশ্নে কোনও রফাসূত্র না মেলায়, ভোটের আগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা। আন্দোলন যত ছড়িয়ে পড়ছে, ততই কঠোর হচ্ছে প্রশাসনের অবস্থানও। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নির্বাচনের আগে এই সংকট নিরসন না হলে সংঘর্ষ আরও বাড়বে। বাড়বে হতাহতের সংখ্যাও।