• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 5 July, 2026

ভারত-জাপান ঐতিহাসিক চুক্তির দিকে তাকিয়ে বিশ্ব

বাংলাদেশ-চিন, পাকিস্তান এবং আমেরিকা যখন চাপ তৈরি করছে ভারতের উপর, ঠিক সেই সময় ভারতের পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘ছোট বোন’ সানায়ে তাকাইচি।

ভারত-জাপান ঐতিহাসিক চুক্তির দিকে তাকিয়ে বিশ্ব

1093162316

বাংলাদেশ-চিন, পাকিস্তান এবং আমেরিকা যখন চাপ তৈরি করছে ভারতের উপর, ঠিক সেই সময় ভারতের পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘ছোট বোন’ সানায়ে তাকাইচি। ঘটনা হলো, পয়লা জুলাই জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তিনদিনের ভারত সফরে আসেন। এসে তিনি অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেন যার মধ্যে চারটি চুক্তি ঐতিহাসিক। ফলে কোনঠাসা ভারত অনেক অংশেই চাঙ্গা হয়ে পড়ে। নতুবা চিন-আমেরিকার মদতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং তুরস্কের চাপে ভারত অস্বস্ততির মধ্যে ছিল। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার সাফল্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে, তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা যায়, এখন সে ভারতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পথ চলবে। এমন অস্বস্তিকর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের সফল ভারত সফর মোদীর পালে আবার হাওয়া লাগিয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূকৌশলগত রাজনীতিতে ভারতের এই বন্ধুটিকে ভারত আবার নতুন করে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাজনীতিতে জাপানের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানে জাপানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক চুক্তিগুলি অত্যন্ত কার্যকরী এবং গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে জাপানের এই প্রথম সামরিক সংক্রান্ত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হল, যা পূর্বে কখনো হয়নি এবং জাপান এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে খুব একটা সহযোগিতা করে না। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক চুক্তি ভারতের সঙ্গে এই প্রথম করল জাপান। এই প্রতিরক্ষা চুক্তি যে কোনও দেশের পক্ষে অত্যন্ত লোভনীয়। তাই বলা যায়, বিপদের দিনে রাশিয়ার মতো জাপানকেও ভারত পাশে পেল, যা নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। অবশ্য এর আগে প্রধানমন্ত্রী মোদী একটা মাস্টার্স স্ট্রোক দিয়েছিলেন, যা তিনি বিশ্বমঞ্চে মাঝেমধ্যেই দিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই তাঁকে ‘আমার ছোট বোন’ বলে উল্লেখ করেন। মোদীর এই সম্বোধন শুনে বিস্মিত তাকাইচি খুব আপ্লুত হয়ে পড়েন! এ কথা ঠিক যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগের কোনও স্থান নেই। সেই আবেগের বশে তিনি অনেক চুক্তি করে ফেললেন, না তা কখনোই হয় না। কারণ চুক্তিগুলি অনেক আগে থেকেই নির্ধারিত এবং চূড়ান্ত হয়ে থাকে। তবে অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই শীর্ষ প্রধানের এই ঘনিষ্ঠতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস সামগ্রিকভবে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার জন্য যা করা হবে না কিংবা যা করতে দ্বিধা থাকে সেগুলি কেটে যায়। ফলে সামগ্রিক সাফল্য অনেকাংশেই বৃদ্ধি পায়, যা সাম্প্রতিক জাপানি প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের সফরে সম্পন্ন হল। ৩ জুলাই দিল্লি ত্যাগের আগে তাকাইচি তা স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন। তাছাড়া এই সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অনেক কাজ দেবে এ কথা তিনি নির্দ্বিধায় উল্লেখ করেছেন। তাই ‘দাদা-বোন’ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা নতুন দিশা হয়ে থাকল।
পূর্ব থেকেই চূড়ান্ত ছিল, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম মেধা, দুর্লভ খনিজ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত সমন্বয় ও সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করা এবং জোরদার করা হবে এই সফরে। তাছাড়া জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা হয়। জাপান-ভারত ১৬ তম বার্ষিক সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করলেন, বিভিন্ন সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। এছাড়াও তিনি জাপান-ভারত যৌথ অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকেও উৎসাহের সঙ্গেই উপস্থিত থাকলেন এবং নানাবিধ সহযোগিতার কথা ও প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করলেন সকলের সামনে। এগুলো যদিও রুটিনমাফিক কাজ, বিশেষ করে জাপান-ভারত ১৬ তম বার্ষিক সম্মেলন। এই সম্মেলন প্রতি বছরেই অনুষ্ঠিত হয়। এক বছর জাপানে, তার পরের বছর ভারতে, যেমন পঞ্চদশ সম্মেলনে গত বছর নরেন্দ্র মোদী জাপানে গিয়েছিলেন এই বৈঠকে যোগ দিতে। এ বছর জাপানের প্রধানমন্ত্রী ভারতে এলেন। তবে এই সম্মেলনে এ বছর যে সাফল্য পাওয়া গেল অতীতে তা কখনও হয়নি৷ সে দিক থেকেও তাকাইচির ভারত সফর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক।
সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার যে, এই  সফর ঘিরে ভারতে তেমন কোনও প্রচার কিংবা হৈচৈ হয়নি যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতে এলে হয়ে থাকে। সেখানে সংবাদমাধ্যমের যে হ্যাংলামো চোখে পড়ে তা প্রকৃতপক্ষে লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় গেলে সেই প্রচার দেওয়া হয় না সেই সম্মান দেওয়া হয় না, কাগজে ছোট্ট করে একটা খবর থাকে। লজ্জার কথা ঠিক এইরকমই ব্যবহার করা হলো জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে। বাংলার প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়া সম্ভবত ভুলেই গেছিল খবরটা সম্পর্কে। কলকাতার কাগজগুলিতে যে ছোট্ট খবর প্রকাশিত হলো তা খুঁজে বার করতে ফেলুদা কিম্বা ব্যোমকেশের সাহায্য দরকার লাগে। প্রকৃতপক্ষে দৈনিক স্টেটসম্যান ছাড়া আর কোনও সংবাদপত্রে এমন গুরুত্ব সহকারে তাকাইচির সফর প্রকাশ করেনি।
ভারত ও জাপানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে৷ তার মধ্যে চারটি চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক চুক্তি, যা প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নামে পরিচিত। চুক্তিগুলো হলো— ১. প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা: ভারত ও জাপানের নৌবাহিনী যৌথভাবে ইউনিকর্ন রেডিও অ্যান্টেনা প্রযুক্তি উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা করবে।
২. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ সেমি-কন্ডাক্টর এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক খাতে সাপ্লাই চেইনের স্মৃতিশীলতা বজায় রাখতে একটি যৌথ রূপরেখা জয়েন্ট রোডম্যাপ গৃহীত হয়।
৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিয়ে উভয় দেশ যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এবং উভয় দেশ পারস্পরিক কৌশল ও তথ্য বিনিময় করবে।
৪. জ্বালানি খাত: জাহাজ নির্মাণ বায়োগ্যাস এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্থনীতিতে উভয় রাষ্ট্র সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এছাড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও দৃঢ় করার জন্য কৌশলগত অংশদারিদ্র বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বহু শিল্পপতি ভারতের নতুন করে বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
প্রায় ১৫০টি জাপানি সংস্থা ভারতে বিনিয়োগ করবে, যার সর্বমোট পরিমাণ প্রায় লক্ষ কোটি ডলারের কাছাকাছি, ঘোষণা করা হয়েছে মারুতিতে আরও ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে এবং নতুন কারখানা তৈরি করা হবে।
প্রসঙ্গক্রমে জানাই, জাপান ভারতের কাছে মোগামি প্রস্তাব রেখেছে। এটা মূলত যুদ্ধজাহাজ এবং নৌবাহিনী সংক্রান্ত বিষয়। তবে এটা নিয়ে একটু বিতর্কে সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ভারত কি স্বদেশী নৌবাহিনী পথ থেকে সরে বিদেশে শক্তির প্রবেশের পথ খুলে দিল? এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ভারত ও জাপানের মধ্যে দিল্লিতে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলি সম্পর্কে উভয়ের দেশেরই জনগণ ও সংবাদমাধ্যম সমর্থন জানিয়েছে। জাপানের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্র দি জাপান টাইমস কৌশলগত  ভুূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। আরেকটি জনপ্রিয় পত্রিকা কিয়ডো নিউজ লিখেছে, চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিরোধে এই চুক্তির অবদান অবিস্মরণীয়। তাছাড়া ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও জাপান ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে। এই চুক্তি আলোচ্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ।