• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 5 July, 2026

শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন নিয়ে পদক্ষেপ রাজ্যের

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় কি এসে গিয়েছে? সাম্প্রতিক এক আলোচনায় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে মন্তব্য করেছেন

শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন নিয়ে পদক্ষেপ রাজ্যের

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় কি এসে গিয়েছে? সাম্প্রতিক এক আলোচনায় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে মন্তব্য করেছেন, তা নিঃসন্দেহে এই প্রশ্নটিকেই সামনে এনে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু সংস্কারের নয়, একেবারে ভিত্তি থেকে পুনর্গঠনের প্রয়োজন। এই মন্তব্য শুনতে কঠোর হলেও, এর ভিতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর বাস্তবতা, যা আমরা অনেকেই অনুভব করি, কিন্তু সরাসরি উচ্চারণ করি না।
এক সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। শুধু ডিগ্রি দেওয়ার কেন্দ্র নয়, চিন্তাভাবনা, গবেষণা এবং নতুন ভাবনার উন্মেষের ক্ষেত্র ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। আজ সেই গৌরব অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। এটি এখন অনেকের কাছে শুধুই একটি ‘স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে পরিচিত। এই পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি; দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা সমস্যার ফল এটি।
প্রথমত, শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশই জোরালো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনার গভীরতা কমছে, গবেষণার পরিবেশ দুর্বল হচ্ছে। দক্ষ শিক্ষকের অভাব একটি বড় সমস্যা। ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষা সম্ভব নয়— এটি একটি সাধারণ সত্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। এর পিছনে রয়েছে চাকরির অনিশ্চয়তা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং কখনও কখনও দুর্নীতির অভিযোগ।
শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তা যুব সমাজের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। যখন একজন যোগ্য প্রার্থী মনে করেন যে তাঁর যোগ্যতা যথাযথ মূল্য পাচ্ছে না, তখন তাঁর মধ্যে হতাশা জন্মায়। এই হতাশা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি ধীরে ধীরে গোটা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট করে। একটি সুস্থ সমাজের জন্য এই আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্রও দুর্বল হয়ে পড়ছে। পড়াশোনা শেষ করার পর অনেক ছাত্রছাত্রী নিজেদের উপযুক্ত কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে তারা অন্য রাজ্যে বা বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে কলকাতার মতো শহরে তরুণদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে— যা অর্থমন্ত্রীর কথায় ‘একটি বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হওয়ার’ ইঙ্গিত দেয়। এই চিত্র নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও আধুনিক দক্ষতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়াও একটি বড় সমস্যা। বর্তমান যুগে শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তা। এই দিক থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যেমন, এক ছাত্র সিবিএসই-র ওয়েবসাইটের দুর্বলতা চিহ্নিত করে যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে, তা দেখায়— সুযোগ পেলে আমাদের তরুণরা কতটা সক্ষম। সেই প্রতিভাকে সঠিক পথে কাজে লাগানোই আসল চ্যালেঞ্জ।
এখন প্রশ্ন হল, সমাধান কী? অর্থমন্ত্রীর মতে, সরকার একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না; তারা কেবল একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বাস্তব কাজটি করতে হবে বিভিন্ন অংশীদারকে— বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের অন্যান্য অংশকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিক্ষা একটি বৃহৎ ক্ষেত্র, যেখানে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তবে বেসরকারি ক্ষেত্রের ভূমিকা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ যেন না হয় এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মানোন্নয়নও সমান জরুরি। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় আনা বা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা— সবই প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গুণগত মান বৃদ্ধি।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের গৌরব আমাদের অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়তে হলে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু সমালোচনা নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শিক্ষা যদি শক্তিশালী হয়, তবে সমাজও শক্তিশালী হবে। আর সেই লক্ষ্যেই এখন সময় ভিত্তি থেকে নতুন করে গড়ে তোলার।