• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 3 July, 2026

চিন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর: কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আলোচনার নতুন বিষয় হয়ে উঠেছে চিনের প্রস্তাবিত কুনমিং-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর।

চিন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর: কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আলোচনার নতুন বিষয় হয়ে উঠেছে চিনের প্রস্তাবিত কুনমিং-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বাণিজ্যিক ও পরিকাঠামোগত উদ্যোগ— কিন্তু বাস্তবে এর গভীরে রয়েছে বহুস্তরীয় কূটনৈতিক টানাপোড়েন, আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের সামনে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা।
চিনের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সরাসরি এই প্রস্তাব উঠে উঠেছে। তবে একে নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য ভাবলে ভুল হবে, বরং একটি সুপরিকল্পিত ভূ-কৌশল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন সফরে এই করিডোর নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে, বেইজিং এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ঢাকার প্রতিক্রিয়াও নেহাত ঠান্ডা নয়; বরং ‘পর্যালোচনা’ শব্দের আড়ালে এক ধরনের সতর্ক আগ্রহই ধরা পড়ছে।
প্রস্তাবিত করিডোরের রূপরেখা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ইউনানের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মান্দালয় পেরিয়ে এই পথ একদিকে ইয়াঙ্গন, অন্যদিকে রাখাইনের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছবে। সেখান থেকে সড়ক ও রেল যোগাযোগে যুক্ত হবে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম। অর্থাৎ, এক ঝটকায় দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করার পরিকল্পনা।
এই ভাবনা নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি আগে ‘বিসিআইএম’ (বাংলাদেশ-চিন-ভারত-মায়ানমার) করিডোরের ধারণা সামনে এনেছিল চিন। কিন্তু ভারতের আপত্তির জেরে সেই উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়। আজ ভারতের অনুপস্থিতিতে নতুন করে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের চেষ্টা— স্বাভাবিকভাবেই দিল্লির দৃষ্টি এড়াবে না।
কিন্তু করিডোরের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বাইরের নয়, ভেতরের এবং তা মায়ানমার। এই দেশটি এখন কার্যত এক অস্থির রাষ্ট্র। সামরিক জান্তার সঙ্গে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত প্রতিদিনই নতুন রূপ নিচ্ছে। রাখাইনের যে বড় অংশে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ, সেই অঞ্চলের উপর দিয়েই এই করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অতিক্রম করার কথা। সেখানে স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনও দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো প্রকল্প কতটা নিরাপদ, সে প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যায়।
এর সঙ্গে জুড়েছে রোহিঙ্গা সংকট— যা কেবল মানবিক নয়, কৌশলগতও। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার উপস্থিতি সীমান্ত রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান ছাড়া করিডোরের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব— দুটিই প্রশ্নের মুখে।
তবু চিন যদি তার অর্থনৈতিক স্বার্থে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় এবং বাংলাদেশ যদি বাস্তববাদী কূটনীতি অবলম্বন করে, তবে এই করিডোর কার্যকর হওয়া অসম্ভব নয়। বরং তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকে এই প্রকল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ— এটি যে কোনও উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিরাট সুযোগ। একই সঙ্গে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সহজ হবে। পরিবহন ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলিতে বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষত চিনা পুঁজি, প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।
কিন্তু এই সম্ভাবনার পথ মোটেই মসৃণ নয়। ভারতের অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ যদি এই করিডোরে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়, তবে তা ভারতের কৌশলগত পরিসরে প্রভাব ফেলতে পারে এবং তার প্রতিক্রিয়াও আসতে পারে।
অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমী শক্তির সমীকরণ। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ এমন কোনও পদক্ষেপ নিতে পারবে না, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তের অন্তর্নিহিত লক্ষ্যই চিনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ। ফলে ঢাকার প্রতিটি পদক্ষেপই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায়।
এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নতুন মাত্রা পাচ্ছে। চিনের কারিগরি সহায়তার আগ্রহ বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসংকট নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এই প্রকল্প কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এখানেও ভারতের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি ছাড়া এই প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন কঠিন এবং সেই চুক্তিই দীর্ঘদিন ধরে অধরা।
অতএব, করিডোর হোক বা তিস্তা— দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে একই সঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হবে। একদিকে চিনের বিনিয়োগ ও পরিকাঠামোগত প্রস্তাব, অন্যদিকে ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রভাব, তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক কৌশল— এই ত্রিমুখী সমীকরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢাকাকে পথ খুঁজতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক দক্ষতাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। অতিরিক্ত ঝুঁকির পথ এড়িয়ে, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে, বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলই হতে পারে সঠিক দিশা। করিডোরের প্রলোভন যতই আকর্ষণীয় হোক, তার প্রতিটি ধাপে লুকিয়ে রয়েছে কাঁটা।
এই প্রকল্প কেবল একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়— এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষা। সুযোগ ও সংকট— দুটিকেই সমানভাবে বুঝে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেই নির্ধারিত হবে এই করিডোরের ভবিষ্যৎ।