• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 1 July, 2026

পরমাণু চুল্লির তাপ থেকে হাইড্রোজেন, বিশ্বে প্রথম অনন্য কীর্তি ভারতের: সুফল পাবে বাংলাও

বিদ্যুৎ ছাড়াই সরাসরি চুল্লির তাপ থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করে ইতিহাস গড়ল কল্পাক্কম। কিউ-সিএল প্রযুক্তি কী, ভারতের হাইড্রোজেন লক্ষ্যমাত্রায় এর গুরুত্ব কতটা, রইল বিশ্লেষণ।

পরমাণু চুল্লির তাপ থেকে হাইড্রোজেন, বিশ্বে প্রথম অনন্য কীর্তি ভারতের: সুফল পাবে বাংলাও

গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন (AI নির্মাণ)

পরমাণু চুল্লি মানেই এতদিন কেবলমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা মনে আসত। সেই ধারণাটাই বদলে দিল ভারত। তামিলনাড়ুর কল্পাক্কমে (Kalpakkam) পরমাণু শক্তি দপ্তরের (Department of Atomic Energy) বিজ্ঞানীরা এমন একটি কেন্দ্র চালু করেছেন, যেখানে বিদ্যুৎ নয়, সরাসরি চুল্লির তাপ থেকেই তৈরি হচ্ছে হাইড্রোজেন। বিশ্বে এই প্রথম কোনও দেশ পরমাণু প্রসেস হিট (nuclear process heat) ব্যবহার করে হাইড্রোজেন উৎপাদনের কারখানা চালু করল। গত ২৬ জুন ইন্দিরা গান্ধী সেন্টার ফর অ্যাটমিক রিসার্চের (IGCAR) এই প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অজিত কুমার মোহান্তি।

কল্পাক্কমে হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট
কল্পাক্কমে হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট

প্রযুক্তিটা আসলে কী

এই কেন্দ্রে ব্যবহার হয়েছে দেশীয়ভাবে তৈরি কপার-ক্লোরিন থার্মোকেমিক্যাল সাইকেল (Copper-Chlorine Thermochemical Cycle), সংক্ষেপে কিউ-সিএল (Cu-Cl) পদ্ধতি। সহজ ভাষায় বললে, তামা আর ক্লোরিনের যৌগ ব্যবহার করে চারটি ধাপে জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনে আলাদা করা হয়। প্রক্রিয়ার মাঝে ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য, ফলে বর্জ্য প্রায় থাকেই না। এই তাপ আসছে কল্পাক্কমের ফাস্ট ব্রিডার টেস্ট রিয়্যাক্টর (Fast Breeder Test Reactor বা FBTR) থেকে, যেটি ১৯৮৫ সাল থেকে চালু এবং ভারতের প্রথম ফাস্ট ব্রিডার চুল্লি। এই কেন্দ্র প্রযুক্তিগতভাবে গড়ে তুলেছে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) এবং আইজিসিএআর যৌথভাবে।

কেন এই পদ্ধতি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে

সাধারণত সবুজ হাইড্রোজেন তৈরি হয় বিদ্যুৎ চালিত ইলেকট্রোলাইসিসের (electrolysis) মাধ্যমে, যার কার্যকারিতা মোটামুটি ২৪ শতাংশের আশপাশে থাকে। অন্যদিকে পরমাণু তাপ ব্যবহার করে থার্মোকেমিক্যাল পদ্ধতিতে হাইড্রোজেন তৈরির তাত্ত্বিক কার্যকারিতা পৌঁছতে পারে প্রায় ৫০ শতাংশে। অর্থাৎ একই পরিমাণ শক্তি দিয়ে দ্বিগুণ হাইড্রোজেন পাওয়ার সম্ভাবনা। পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অনিল কাকোদকর বলেছেন, কার্বন নিঃসরণের বিচারে এই প্রক্রিয়া সবুজ হাইড্রোজেনের সমতুল্য, যদিও উৎস হিসেবে এটি নবীকরণযোগ্য শক্তি নয়, পরমাণু শক্তি।

আরও পড়ুন: এবার বাংলায় বিনামূল্যে রেশন: যোগ্যতা ও আবেদনের সহজ নিয়ম জেনে নিন

ছোট পরীক্ষাগার, বড় স্বপ্ন

এখানে একটা বাস্তবতা মাথায় রাখা জরুরি। এই কেন্দ্রটি এখনও একটি টেকনোলজি ডেমনস্ট্রেটর, অর্থাৎ পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী প্রকল্প। বাণিজ্যিক স্তরে হাজার হাজার টন হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য যে আকারের কারখানা দরকার, তার থেকে এটি এখনও অনেক দূরে। আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র বলছে, কিউ-সিএল পদ্ধতিতে হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচ এখনও প্রতি কেজিতে প্রায় ৫ ডলার (প্রায় ৪৭৩ টাকা) এর আশপাশে, যা বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে আরও অনেক প্রযুক্তিগত উন্নতি দরকার। অর্থাৎ কল্পাক্কমের এই সাফল্য বিজ্ঞানের দিক থেকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, শিল্পের দিক থেকে ততটাই দীর্ঘ পথ এখনও বাকি।

ভারতের হাইড্রোজেন লক্ষ্যমাত্রার হিসেবে কোথায় বসছে এই আবিষ্কার

ভারত সরকারের ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশনের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৫০ লক্ষ টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন এবং উৎপাদন খরচ কমিয়ে প্রতি কেজি দেড় ডলারে (প্রায় ১৪২ টাকা) নামিয়ে আনা। বর্তমানে ইলেকট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে সবুজ হাইড্রোজেনের খরচ পড়ছে প্রতি কেজি চার থেকে পাঁচ ডলার (প্রায় ৩৭৮ থেকে ৪৭৩ টাকা), যেখানে প্রচলিত ধূসর হাইড্রোজেনের খরচ মাত্র আড়াই ডলারের (প্রায় ২৩৭ টাকা) কাছাকাছি। পরমাণু তাপ ভিত্তিক এই নতুন পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবধান কমানোর একটা বিকল্প পথ দেখাচ্ছে, বিশেষ করে ভারতের তিন ধাপের পরমাণু কর্মসূচিতে ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টরের ভূমিকা বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাইরেও বিস্তৃত করার কৌশলগত দিক থেকে।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযোগ কোথায়

পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যে দেশের হাতে গোনা যে ছয়টি রাজ্য নিজস্ব সবুজ হাইড্রোজেন নীতি ঘোষণা করেছে, তার একটি। হলদিয়ায় (Haldia) ইন্দোরামা ইন্ডিয়ার কারখানায় সবুজ অ্যামোনিয়া সরবরাহের জন্য সেকির (SECI) নিলামে যে দর উঠেছিল, তা ছিল প্রতি কেজি ৬৪.৭৪ টাকা, গোটা দেশের নিলামে সর্বোচ্চ দরগুলোর একটি। এই তথ্যই বলে দেয়, পূর্ব ভারতে সবুজ হাইড্রোজেনের খরচ এখনও কতটা বেশি। গবেষণা সংস্থা সিইইডব্লিউ-র (CEEW) মতে, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশায় ঘনীভূত লোহা ও ইস্পাত শিল্পের জন্য সবুজ হাইড্রোজেন ভবিষ্যতে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। কল্পাক্কমের এই প্রযুক্তি যদি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক স্তরে পৌঁছয়, তাহলে হলদিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলের জন্য সস্তায় হাইড্রোজেন পাওয়ার আরেকটা রাস্তা খুলতে পারে। তবে এটা এখনই ধরে নেওয়ার সময় আসেনি, কারণ পরীক্ষাগার থেকে কারখানায় পৌঁছতে সাধারণত এক দশকের বেশি সময় লেগে যায়।

সব মিলিয়ে ছবিটা কেমন

কল্পাক্কমের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান ও কৌশলগত দিক থেকে ভারতের জন্য বড় প্রাপ্তি। চার দশকের ফাস্ট ব্রিডার প্রযুক্তি অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে দেশীয় গবেষণায় তৈরি এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে দিল, পরমাণু চুল্লি শুধু বিদ্যুৎ নয়, ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অন্যতম উৎসও হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে এটি একটি ছোট আকারের পরীক্ষামূলক প্রকল্প, বাণিজ্যিক বাস্তবতা থেকে এখনও অনেকটা দূরে। উচ্ছ্বাস আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাকটা মনে রাখাই বিচক্ষণতার পরিচয়।