বিজেপি শাসিত উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসমের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও চালু হতে চলেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি)। রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই এই আইন আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্কল্পপত্রে ইউসিসি চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে নতুন প্রশাসন। ইতিমধ্যেই এই ইউসিসি নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। সমতা না ধর্মীয় স্বাধিকারে হস্তক্ষেপ, তা নিয়ে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা।
ইউসিসি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্কও। বিজেপির দাবি, এই আইন দেশে আইনি সমতা প্রতিষ্ঠা করবে এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, ইউসিসি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইন ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে হস্তক্ষেপ করতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কী। এই বিধি চালু হলে কী সুবিধা হবে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মূল উদ্দেশ্য হল ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের জন্য বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং পারিবারিক অংশীদারির মতো বিষয়ে একই আইনি কার্যকর করা। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক পারিবারিক আইন কার্যকর রয়েছে। ইউসিসি চালু হলে সেই বিভাজন উঠে গিয়ে একটিই আইন কার্যকর হবে। ভারতীয় সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের জন্য উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদিও আদালত কখনও কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারকে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের সরাসরি কোনও নির্দেশ দেয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিবেচনা করে দেখার কথা একাধিকবার বলেছে সর্বোচ্চ আদালত।
স্বাধীনতার পর থেকেই ইউসিসি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক রয়েছে। ১৯৪৮-এ সংবিধান সভায় এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। সে সময় বহু মুসলিম সদস্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে মুসলিম পার্সোনাল ল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভবিষ্যতের সরকার ও সংসদের উপর এই আইন কার্যকর দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। কেন্দ্রে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন বিষয়টি নিয়ে আর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কিন্তু ২০২৩-এ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইউসিসি নিয়ে সরব হন। তাঁর বক্তব্য ছিল, একই দেশে একাধিক ব্যক্তিগত আইন দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী এবং সমান অধিকারের পথে বাধা।
মোদী ইউসিসি চালু করার পক্ষে সওয়াল করতেই ২০২৪-এ প্রথম বিজেপি শাসিত উত্তরাখণ্ডে ইউসিসি চালু হয়। পরে গুজরাট এবং আসামের বিজেপি সরকারও একই পথে হাঁটে। এই তিন রাজ্যেই বিয়ের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকী, উত্তরাখণ্ডে ‘লিভ-ইন’ সম্পর্ককেও নথিভুক্ত করার বিধান রয়েছে। নিবন্ধন না করলে জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ করা হয়েছে বহুবিবাহ।
তিন রাজ্যেই সম্পত্তির ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর এবং ছেলে-মেয়ের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য রাখা হয়নি। তবে জনজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায়কে ইউসিসি-র আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক শিবির এবং আইনজীবীদের একাংশের ধারণা, পশ্চিমবঙ্গেও উত্তরাখণ্ড-গুজরাট-আসাম মডেল অনুসরণ করা হবে। এই আইন কার্যকর হলে আদিবাসী ও জনজাতি সম্প্রদায় তাঁদের নিজস্ব অধিকার হারাবেন। বিরোধীদের তোলা এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ রাজ্যের জনজাতি সম্প্রদায়কেও ইউসিসি-র বাইরে রাখা হবে।
বর্তমানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব পারিবারিক আইন রয়েছে। কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, দত্তক গ্রহণ এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে সবার জন্য একই আইন কার্যকর হবে। তবে বিয়ের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এতে ব্যক্তিগত জীবনে সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়বে এবং প্রশাসনের অতিরিক্ত নজরদারির সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে বিজেপির পাল্টা যুক্তি, এর ফলে বাল্যবিবাহ, প্রতারণা এবং বহুবিবাহের মতো ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, উত্তরাখণ্ড, গুজরাট ও আসামে ইউসিসি চালুর আগে বিশেষ কমিটি গঠন করে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রের ইঙ্গিত। ফলে বিধানসভার আগামী অধিবেশনেই ইউসিসি বিল আনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইতিমধ্যেই বিজেপি-শাসিত উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থান ইউসিসি চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তার আগেই পশ্চিমবঙ্গ এই আইন কার্যকর করে দেশের চতুর্থ ইউসিসি-রাজ্যে পরিণত হয় কিনা, সেটাই দেখার।




