তামিলনাড়ুর একটি সি-ফুড প্রসেসিং কারখানায় সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা আবার আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তব তুলে ধরেছে— ভারতে শ্রমিকদের জীবনে এখনও কতটা নিরাপত্তার অভাব। গত রবিবার, যখন কারখানাটি কার্যত বন্ধ থাকার কথা, সেই সময়েই অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক করে বহু শ্রমিকের জীবন বিপন্ন করে তোলে। যাঁরা সেখানে কাজ করতেন, তাঁদের অনেকেই ওই কারখানার দেওয়া আবাসনেই থাকতেন। বিশ্রামের মুহূর্তেই বিষাক্ত গ্যাস তাঁদের শ্বাসরোধ করে। একের পর এক মৃত্যু যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
সরকারি তৎপরতা অবশ্য ছিল দ্রুত। নতুন সরকার দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, বিপর্যয় মোকাবিলা দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞদেরও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল— নিরাপত্তার ব্যবস্থা কি দুর্ঘটনার আগে নেওয়া যেত না? দুর্ঘটনার পর সক্রিয় হওয়া প্রশাসন কি সত্যিই দায় এড়াতে পারে?
প্রাথমিক তদন্তেই স্পষ্ট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। কোনও কার্যকর অ্যালার্ম সিস্টেম ছিল না, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও প্রায় অকেজো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত তদারকির অভাব। অর্থাৎ এই দুর্ঘটনা হঠাৎই ঘটে যাওয়া কোনো ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল।
এই ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— মৃত ও আহতদের অধিকাংশই ওড়িশা থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক। কেন এমন হয়? কারণ স্থানীয় মানুষ এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও কম মজুরির কাজ করতে চান না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র শ্রমিকরাই এই কাজ করেন। তাঁরা প্রায়শই অরক্ষিত পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন, কারণ তাঁদের সামনে বিকল্প খুব কম।
এই পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থান সমাজে সবচেয়ে দুর্বল। তাঁরা অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ভাষা, সংস্কৃতি, আইনি সহায়তা— সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকেন। ফলে দুর্ঘটনার সময় তাঁদের জন্য ন্যায্য বিচার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এই দুর্ঘটনাও সেই বৃহত্তর সমস্যারই অংশ।
প্রতিবার এমন দুর্ঘটনার পরে সরকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে। মৃতদের পরিবারের জন্য কিছু টাকা, আহতদের জন্য কিছু সহায়তা— এই নিয়ম যেন এক ধরনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একটি জীবনের মূল্য কি শুধু কিছু টাকায় মাপা যায়? একজন শ্রমিকের মৃত্যু মানে শুধু একটি পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
সমস্যার মূল জায়গাটি হল, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। কারখানাগুলিতে নিরাপত্তা নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য নিয়মিত পরিদর্শনের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না বা যথাযথভাবে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের প্রভাব বা প্রশাসনিক শিথিলতা এই ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, নিরাপত্তার মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং তা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অবহেলা করতে সাহস না পায়।
সেইসঙ্গে আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার। আমরা যতদিন না শ্রমিকদের জীবনকে সমান মর্যাদা দিচ্ছি, ততদিন এই ধরনের দুর্ঘটনা থামবে না। উন্নয়নের কথা বলি আমরা, শিল্পায়নের কথা বলি— কিন্তু সেই উন্নয়নের ভিত্তি যদি হয় শ্রমিকের রক্ত ও অশ্রু, তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানবিক?




