• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 22 June, 2026

মাৎস্যন্যায়-সেকাল ও একালের

খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে বারবার বৈদেশিক আক্রমণের কারণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে

৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ— দীর্ঘ একশো বছর বাংলার ইতিহাসের অতি কুৎসিত কাল। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার রাজা শশাঙ্কের মৃত্যু হয়। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণে। শশাঙ্ক ছিলেন গৌড় সাম্রাজ্যের সার্বভৌম রাজা। তিনি বাংলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদকে একত্রিত করে সুবিশাল গৌড় রাজ্য গড়ে তোলেন। মালবরাজ দেবগুপ্ত তাঁর বন্ধু ছিলেন।

কনৌজরাজ প্রভাকর বর্ধনের জ্যেষ্ঠপুত্র রাজ্যবর্ধনের সঙ্গে যুদ্ধে দেবগুপ্ত নিহত হন। শশাঙ্ক কনৌজরাজ রাজ্যবর্ধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাঁকে হত্যা করেন। এরপর রাজ্যবর্ধনের ভাই হর্ষবর্ধন তাঁর বন্ধু কামরূপরাজা ভাস্কর বর্মাকে নিয়ে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেও তাঁকে পরাজিত করতে পারেননি। ৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর দুই বছর পর থেকে বাংলায় অতি নিকৃষ্টমানের শাসন শুরু হয়।

বড় মাছ যখন সুযোগ পেলেই ছোট মাছকে মেরে ফেলে তেমনই বাংলার বুকে মন্ত্রীদের রাজত্ব শুরু হয়ে যায়। এই সময় চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে) ভারতবর্ষের মগধে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণের জন্য এসেছিলেন। সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দুটি নতুন রাজবংশ আত্মপ্রকাশ করে। পশ্চিমে বাংলা ও দক্ষিণ বিহারে (গৌড় ও মগধে) পরবর্তী গুপ্তগণ এবং বঙ্গ ও সমতট (দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব বাংলা) খড়গ রাজবংশ। কিন্তু এই রাজবংশগুলোর কোনটিই বাংলায় ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি বলে ধারণা করা হয়।

খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে বারবার বৈদেশিক আক্রমণের কারণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল কনৌজরাজ যশোবর্মনের আক্রমণ। কাশ্মিরের ললিতাদিত্য যশোবর্মণের গৌরবকে ম্লান করে দেন। গৌড়ের পাঁচজন রাজা ললিতাদিত্য কর্তৃক পরাজিত হয়েছিলেন। কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কলহন তাঁর লেখা বই রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থে একথা উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া পাল আমলের লিপি খালিমপুর তাম্রশাসনে মাৎস্যন্যায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিব্বতীয় সন্ন্যাসী তারানাথের গ্রন্থ ‘ভারতে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস’ থেকে জানা যায় প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, ব্রাহ্মণ ও বণিক স্ব-স্ব গৃহে (অথবা প্রভাবাধীন এলাকায়) এক একজন রাজা, কিন্তু সমগ্র দেশে কোনও রাজা ছিলো না। এরপরে ডা. নীহাররঞ্জন গুপ্তের ভাষায়, ‘দেশময় উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মত্ততা— এমন যখন হয় দেশের অবস্থা, প্রাচীন অর্থশাস্ত্রে তাহাকেই বলে মাৎস্যন্যায়, অর্থাৎ বৃহৎ মৎস্য কর্তৃক ক্ষুদ্র মৎস্য গ্রাসের যে ন্যায় বা যুক্তি, সেই ন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব।’

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে, যখন বিচারের অভাবে ক্ষমতাবান দুর্বলকে গ্রাস করে, যেমন বড় মাছ সাবাড় করে ছোটো মাছকে, এমন অবস্থাকে বলা যায় মাৎস্যন্যায়।৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গোপাল বাংলার সিংহাসনে আরোহন করবার পরে তৎকালীন বাংলা থেকে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটেছিলো।

এবারে আসি একালের বাংলার বুকে আধুনিক যুগে বাংলায় মাৎস্যন্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে। ব্যাপকভাবে ভোটচুরি এবং নিরীহ মানুষের হত্যালীলার মাধ্যমে একজন স্বৈরাচারী শাসকের নেতৃত্বে এই মাৎস্যন্যায়ের সূত্রপাত হয়েছিল। তবে এই মাৎস্যন্যায়ের ঢংবরাত প্রাচীনকালের মাৎস্যন্যায় অপেক্ষা নিকৃষ্ট মানের।

চৌর্য্যবৃত্তি এইসময়ে ব্যাপকভাবে বর্ধিত হয়েছিল। প্রকাশ্যে লুটতরাজ একটু কম ছিল, তা বলা যাবে না। আসলে এই মাৎস্যন্যায়ের পিছনে একজন নয় একাধিক ব্যক্তির হাত একটি দলের লোকজনদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছিল। একালে নরহত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রসমূহ অনেক উন্নতমানের।

পিস্তল, বন্দুক, রাইফেল, বোমা, ইত্যাদি। ক্ষমতার আধিক্যের জন্যেই একালের মাৎস্যন্যায় একই দলের বা বিরোধী দলের ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিবর্গের প্রতিহিংসা-পরায়ণতার জন্যই। মাৎস্যন্যায়ের মতোই ঘটনাবলী গত দশ বছরে এই রাজ্যের বুকে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া এই মাৎস্যন্যায়ের কালে দুর্নীতির ব্যাপক অপপ্রয়োগ ঘটতে দেখা গিয়েছে।

যাই হোক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাসী মানুষজন এবার রাজ্যে মাৎস্যন্যায় সৃষ্টিকারী দলকে নির্বাচনে পরাজিত করে রাজ্যে যাতে মাৎস্যন্যায় সংঘটিত আর কখনোই না হয় সেজন্যই কঠোর শাসন প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন। যেহেতু এই রাজ্যের জনগণ গত দশ বছরে মাৎস্যন্যায় শাসনাধীনে কালাতিপাত করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেজন্যই তার বিবরণ লেখা অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়েছে।

তবে একালের এই রাজ্যের প্রছন্ন মাৎস্যন্যায় সপ্তম-অষ্টম শতকের বাংলার একশো বছরের মাৎস্যন্যায়কে ছাপিয়ে গিছে কিনা সেটা এখানে উল্লেখ করবার ইচ্ছা নেই। তাই সেকালের ও একালের এই রাজ্যে ঘটে যাওয়া মাৎস্যন্যায়ের সেকালের একশো বছরের (৬৫০ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের) এবং একালের  মাৎস্যন্যায়ের (২০১৬ থেকে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের  প্রথম চার মাস) কিছু কথা তুলে ধরতে
চেষ্টা করা হল।