• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 15 June, 2026

জরাজীর্ণ গ্রন্থাগারের সংস্কার প্রয়োজন

২৪৮০টি গ্রন্থাগারের মধ্যে ২৪৬০টি সরকার পোষিত এবং ৭টি গ্রন্থাগার আছে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত

আমাদের রাজ্যের পাঠাগারগুলির হাল হকিকৎ একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই রাজ্যে সাকুল্যে ২৪৮০টি গ্রন্থাগার বা পাঠাগার আছে আর এগুলোর মোট সংগ্রহ প্রায় এক কোটি আশি লক্ষ বই। লক্ষ লক্ষ টাকার বই গ্রন্থাগারগুলোতে রাখা আছে। গ্রামীণ গ্রন্থাগারগুলো গড়ে তোলার মূল কারণ ছিল গ্রামের মানুষ এবং তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের অর্থাৎ গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের বই পড়ার মানসিকতা গড়ে তোলা। ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে সামান্য সদস্য-সদস্যা হিসেবে গ্রহণ করে বই কিনতে না পারার অক্ষমতা সত্ত্বেও পুস্তক পাঠের সহায়তা দান করা।

এই ২৪৮০টি গ্রন্থাগারের মধ্যে ২৪৬০টি সরকার পোষিত এবং ৭টি গ্রন্থাগার আছে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত। রাজ্যের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ১টি। এটি কলকাতার বিধাননগরে অবস্থিত। উত্তরবঙ্গ রাজ্য গ্রন্থাগার এবং কলকাতা মহানগর গ্রন্থাগার-সহ জেলা গ্রন্থাগার আছে ২৬টি। শহর-মহকুমা গ্রন্থাগার ২৩৬টি। গ্রামীণ এলাকা ও প্রাথমিক ইউনিট গ্রন্থাগার ২২০৯টি। এর মধ্যে এই রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের গ্রন্থাগারসমূহ আছে। এবার জেলা অনুযায়ী বন্টন— উত্তর ২৪ পরগনা ২২৫টি, পূর্ব বর্ধমান ১৫১টি, পশ্চিম বর্ধমান ১০৫টি, হুগলি ১৫৯টি, মুর্শিদাবাদ ১৫৯টি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ১৫৬টি, হাওড়া ১৩৭টি। এছাড়া অন্যান্য জেলাগুলোতে ১০০ থেকে ১৩০টি গ্রন্থাগার আছে।

গ্রামীণ এলাকার পাঠাগারগুলোতে সাধারণত ২ হাজার থেকে ৫ হাজার বই আছে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা বড় কোনও কমিউনিটি প্রোজেক্টের অধীনে পরিচালিত বড় পাঠাগারগুলোতে বইয়ের সংখ্যা ১৫ হাজার বা তার বেশিও হতে পারে। খুব ছোট কমিউনিটি বা গ্রামীণ সামাজিক পাঠাগারে সাধারণত ৫০ থেকে ৫০০টি বই থাকে। তবে এই ধরনের পাঠাগার সংখ্যায় খুবই কম।মাঝারি গ্রামীণ পাঠাগারে গড়ে ২০০০ থেকে ৫০০০ বই থাকে, যা স্কুল কলেজ পড়ুয়া ও সাধারণ পাঠকদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

বৃহৎ বা কেন্দ্রীয় গ্রামীণ পাঠাগারগুলোতে বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। প্রতিবছর বিভিন্ন জেলা বইমেলা চলাকালীন বিভিন্ন লেখকের লেখা পুস্তক সংগ্রহের কথা সরকারি আদেশনামায় বলা থাকলেও জেলা বইমেলাগুলোতে এই আদেশপালন করা হয় না, সরকারি অর্থের যথাসময়ে আনুকূল্য না থাকায়।বেশ কিছু গ্রন্থাগার উইপোকা আর ইঁদুর এবং মদের বোতলের আড্ডাখানা হিসেবে স্বীকৃতিলাভ করেছে। গ্রন্থাগারিক নেই বেশ কিছু গ্রন্থাগারে। গ্রন্থাগার সহায়কদেরও হাল তথৈবচ। নাইট গার্ড বা নৈশ প্রহরীর রক্ষণাবেক্ষণে কিছু কিছু পাঠাগারের অতি বেহাল অবস্থা।

রাজ্যের প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর মধ্যে গ্রন্থাগার পৃথক দপ্তর এবং তার প্রশাসনিক দায়িত্বে একজন মন্ত্রীকেও এর আগের সরকার দায়িত্বভার দিয়েছিলেন।
ইদানিং বই পড়তে মানুষ তেমন কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। গ্রন্থাগারের পাঠকের সদস্যপদের সংখ্যা অতিমাত্রায় হ্রাস পেয়েছে। কোনও রাজনৈতিক দলের আড্ডাখানা হিসেবে কোনও কোনও গ্রাম্য পাঠাগারকে ব্যবহার করবার খবরও শোনা গিয়েছে। এই রাজ্যের শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে ক্রমহ্রাসমান। কিছু কিছু ছাত্র-ছাত্রী তাদের বই কেনার জন্যে অপারগ হওয়াতে তারা পাঠাগার থেকে পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহ করে অতিকষ্টে কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়ে তাদের স্কুলের পড়াশুনা চালিয়ে যেত।

এইসব চিত্র এখনকার সময়ে আর সচরাচর দেখা যাচ্ছে না। পাঠাগারগুলোতে বইয়ের প্রতি যত্নের অভাব দারুণভাবে পরিলক্ষিত হয়। উইপোকা, ইঁদুরের দৌরাত্ম্য ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তথা গ্রন্থাগারগুলোতে সুদীর্ঘকাল ধরে গ্রন্থাগারিক এবং গ্রন্থাগারিক সহায়ক পদে কোনও কর্মী নিয়োগ না হওয়ায় গ্রন্থাগারগুলো অযত্নরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এই ব্যাপারে প্রশাসনিক ঔদাসীন্যের কারণে গ্রন্থাগারের পুস্তক সংরক্ষণের দিকে তেমনভাবে দৃকপাত করা হয়নি।

অথচ এই গ্রন্থাগারগুলোই একসময়ে মানুষের মন ও বুদ্ধির বিকাশে সুন্দরতম ভূমিকা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছিল বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান অবনতির কারণেও গ্রন্থাগারগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এ কথা বলা যেতে পারে।
গত দশ বছরে সবথেকে বেশি অবহেলিত দপ্তর ছিল গ্রন্থাগার দপ্তর। গ্রামীণ গ্রন্থাগারগুলোর হাল একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। একবার নাকি এই দপ্তরের মন্ত্রী মহোদয় সমস্ত ২৪৮০টি গ্রন্থাগারে কত সংখ্যক বই আছে তা গণনা করবার চিন্তা করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে তা আর অগ্রগতি না পেয়ে ভাবনার স্তরেই থেকে যায়।

এখন এই গ্রন্থাগার সম্পর্কিত নানান সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায়, ভেবে দেখা যেতে পারে—

১) বইপত্র ও তার সংরক্ষণ এবং বইপত্রসমূহের বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরিচর্যা এবং নিরাপত্তাদানের ব্যবস্থাগ্রহণ করা, যাতে বইগুলো উইপোকা ও ইঁদুরের খাদ্য না হয়ে ওঠে। এছাড়াও জলে ভিজে বইগুলো যাতে নষ্ট না হয়ে যায়, সেজন্যে উন্নতমানের সুরক্ষাব্যবস্থার আয়োজন করা আবশ্যক। ২) পাঠাগার কক্ষগুলো কঠোরভাবে সুরক্ষিত ও যথেষ্ট পরিমাণে আলোবাতাসযুক্ত রাখার ব্যবস্থাগ্রহণ করা প্রয়োজন। ৩) পাঠাগার পরিচালন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারি গ্রন্থাগার দপ্তরের বৈঠকে উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ের পর্যালোচনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে গ্রন্থাগারগুলির হাল ফেরাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ দরকার।

৪) সরকারের অনুমোদন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প রূপায়ণের মাধ্যমে অর্থসংগ্রহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।৫) গ্রন্থাগারের সদস্য সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট হওয়ার প্রয়োজন এবং তার থেকে পাওয়া অর্থে পুস্তকক্রয় করা যেতে পারে।৬) গ্রন্থাগারিক, গ্রন্থাগারিক সহায়ক এবং নৈশপ্রহরী এই সকল কর্মীপদে অবশ্যই সুদক্ষ কর্মী থাকা সবিশেষ প্রয়োজনীয়।৭) পাঠাগারের মধ্যে পাঠকদের উন্নত মানসিকতা ও পঠনপাঠনে আগ্রহের বিকাশ ঘটানোর জন্য বিভিন্ন ছোটো বা বড় শিক্ষামূলক তথা তথ্যচিত্রের বিনামূল্যে (শিক্ষাদপ্তর থেকে আনা) প্রদর্শনীর আয়োজন করা প্রয়োজন।

৯) নতুন ও বৈচিত্র্যময় বই সংগ্রহ করা প্রয়োজন। সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অতি অবশ্যই প্রয়োজন। পাঠাগারে ইন্টারনেট সুবিধা, ই-বুক এবং ডিজিটালাইজড ক্যাটালগ সিস্টেমের প্রয়োগ ঘটালে ভালো হয়। ১০) এছাড়া বিতর্কসভা, পুস্তক পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন ধরনের কুইজ কম্পিটিশনের মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রথম শ্রেণীর বাংলা পত্রপত্রিকা (বড়দের ও ছোটদের উভয়ই) রাখা এবং দেওয়াল পত্রিকার ব্যবস্থা করা আর যদি সম্ভব হয়, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক বা বার্ষিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা রাখতে পারলে খুব ভালো হয়।