• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 15 June, 2026

বিপন্ন বাংলার চালচিত্র

ভারতের জিডিপিতে পশ্চিমবঙ্গের অবদান ১৯৬০-এর দশকের ১১% থেকে কমে ২০১১ সালে মাত্র ৬%-এ দাঁড়ায়; অন্যদিকে মহারাষ্ট্র ও গুজরাত দ্রুত এগিয়ে যায়ন

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

স্বাধীনতার সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান শিল্পোন্নত রাজ্য। কলকাতা ও হুগলি অঞ্চল পাট, ইঞ্জিনিয়ারিং ও রাসায়নিক শিল্পের ব্যস্ত কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বামপন্থীদের উস্কে দেওয়া শ্রমিক অসন্তোষ এবং নকশাল আন্দোলন শিল্পের ভিত্তিকে পঙ্গু করে দেয়। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর পুঁজির বহির্গমন আরও ত্বরান্বিত হয়। ফলস্বরূপ, ভারতের জিডিপিতে পশ্চিমবঙ্গের অবদান ১৯৬০-এর দশকের ১১% থেকে কমে ২০১১ সালে মাত্র ৬%-এ দাঁড়ায়; অন্যদিকে মহারাষ্ট্র ও গুজরাত দ্রুত এগিয়ে যায়।

এই সময়ে ভারতের জিডিপিতে মহারাষ্ট্রের অবদান বেড়ে ১৫% এবং গুজরাতের ১০% হয়। ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে এমন পতন দেখা যায়নি। এর ফলে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল)উৎপাদনের হার ১৯৮০-র দশকের ৩০% থেকে ১৯৯০-এর দশকে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর ফলশ্রুতি ছিল, সীমিত স্কেলের অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং চাকুরিতে নিরাপত্তাহীন এক বিশাল শ্রমিকশ্রেণি, যারা কেবল নিরাপত্তার ভরসায় প্রতিবার সিপিএমকে ভোট দিত।

অর্থনীতির এই অধঃপতন বড় কলকারখানাগুলো বন্ধ করে রাজ্যের কাঠামোকে অনানুষ্ঠানিকতার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট ও ‘ঘেরাও’ সংস্কৃতি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ ধ্বংস করে দেয়।১৯৭০-এর দশকের চরম বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় সরকারের ১৯৫২ সালের ‘ফ্রেইট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি’ খনিজ কাঁচামালের পরিবহন খরচে ভর্তুকি দেওয়ায়, রানিগঞ্জ-ঝরিয়ার কাছাকাছি থাকা বাংলার ভৌগোলিক সুবিধা নষ্ট হয়। শিল্পগুলো সহজেই দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে।

ফলস্বরূপ, ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক উদারীকরণ বাংলাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে শিল্প বিনিয়োগের প্রস্তাবের মাত্র ৪.৭% বাংলায় আসে, বাকি সিংহভাগ চলে যায় মহারাষ্ট্র ও গুজরাতে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যক্তিগত পুঁজির প্রতি আদর্শগত বিদ্বেষ এবং ১৯৮০-র দশকের শেষে কম্পিউটারকরণের তীব্র বিরোধিতার কারণে সংগঠিত উৎপাদন ক্ষেত্র স্থবির হয়ে পড়ে।

পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বৃহৎ পুঁজি আকর্ষণের চেষ্টা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ত জমি-আন্দোলনের কারণে ব্যর্থ হয়। সিঙ্গুরের সেই দীর্ঘ ছায়া পরবর্তী ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনকেও তাড়া করেছে। শিল্প করিডোরগুলো স্থানীয় রাজনৈতিক মদতপুষ্ট ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রিত রিয়েল-এস্টেট ও চাঁদাবাজির আখড়ায় পরিণত হয়। ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬,৬৮৮টি কোম্পানি তাদের নিবন্ধিত কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে নেওয়ায় রাজ্যে কেবল সীমিত উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এমএসএমই (MSME) ল্যান্ডস্কেপই পড়ে থাকে।

বাম আমলের শুরুতে ‘অপারেশন বর্গা’ ১৫ লক্ষ ভাগচাষীর আইনি অধিকার সুরক্ষিত করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমির মালিকানা মারাত্মকভাবে প্রান্তিক রূপ নেয়। ২০২২-২৩ সালের মধ্যে ৪০% শ্রমশক্তি জীবনধারণ-ভিত্তিক কৃষিকাজে আটকে পড়ে, যা থেকে মোট উৎপাদনের ১০%-এরও কম আসত। এটি শ্রমিক পরিযয়ানকে ত্বরান্বিত করে বাংলাকে প্রবাসী-আয়ের (রেমিট্যান্স) অর্থনীতিতে পরিণত করে, যেখানে মাত্র ২০% কর্মীর স্থায়ী চাকরি রয়েছে। উৎপাদনশীল কৌশল গড়ে তোলার বদলে তৃণমূল সরকার ঢালাও অনুদান-ভিত্তিক কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে দৃষ্টি দেওয়ায় মূলধন বিনিয়োগের সম্পদ নিঃশেষিত হয়।

এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত ধরেই রাজ্যে এক সাংস্কৃতিক ও মননশীল পরিবর্তন ঘটে, যাকে বলা যায় ‘মাটি ছেড়ে বৈঠকখানায়’ আশ্রয় নেওয়া। হরেকৃষ্ণ কোঙারের মতো প্রথম সারির বামপন্থী নেতারা কৃষক-শ্রমিকের বাস্তব লড়াই থেকে উঠে এসেছিলেন। অথচ, জ্যোতি বসুর যুগে রাজনীতির চালিকাশক্তি মেহনতি মানুষ থেকে দূরে সরে নাগরিক এলিটের বৈঠকখানায় বন্দি হয়। এই ‘বৈঠকখানা বামপন্থা’ চরম বাস্তবতাবর্জিত এক তাত্ত্বিক বলয় তৈরি করে, যার কাছে মানুষের অন্ন-বস্ত্রের চেয়ে তত্ত্বের কচকচানি ও আদর্শের কৃত্রিম শুচিতা বড় হয়ে ওঠে।

নতুন এই পরিমণ্ডলে শিল্পোদ্যোক্তাদের নৈতিক অপরাধী ভাবা হতে লাগল, আর সমাজে দাপট বাড়ল ‘ঝোলাওয়ালা’ তাত্ত্বিকদের। ফলস্বরূপ, ভারতের অন্য প্রান্তের উৎপাদনশীল কর্মসংস্কৃতি বাংলায় কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে জায়গা করে নিল উদ্দেশ্যহীন আড্ডা এবং দেদার ছুটির অলস সংস্কৃতি। একই সঙ্গে ঘটে বুদ্ধিজীবী মহলের ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণ। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন বা মহাশ্বেতা দেবীর মতো কিংবদন্তিরা একসময় বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেন; কিন্তু এই নতুন বৈঠকখানা শ্রেণী সনাতন বিশ্বাসকে অনগ্রসর ও প্রাচীন জ্ঞানকে পৌরাণিক কাহিনী বলে উপহাস করতে শুরু করে।

স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রীচৈতন্যকেও তারা বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেয়। তারা এক চরম সুবিধাবাদী ও খণ্ডিত নৈতিকতার চর্চা শুরু করে, যেখানে বিশ্বজনীন সমস্যায় ক্ষোভ উগরে দেওয়া হতো, অথচ নিজেদের আঙিনায় ঘটে চলা রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক নৃশংসতায় ছিল চোখ বুজে
থাকার নীতি।এই সামাজিক পচন দ্রুত শিক্ষা ব্যবস্থাকে গ্রাস করে। কলকাতা, যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সির মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সূতিকাগার বাংলায় ১৯৮০-র দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্পূর্ণ রাজনৈতিকীকরণ ঘটে।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার স্থান নেয় রাজনৈতিক আনুগত্য। সরকারি স্কুলগুলো প্রাণশক্তি হারায় এবং উচ্চশিক্ষা ক্যাডার রাজনীতি ও ছাত্র সংসদের হিংসার অধীনস্থ হয়। স্থানীয় অর্থনৈতিক সুযোগ উবে যাওয়ায় বুদ্ধিবৃত্তিক মেধার বিশাল বহির্গমন (ব্রেন ড্রেন) ঘটে। তৃণমূল শাসনামলেও বিদ্যায়তনগুলো উপদলীয় কোন্দল ও সংঘর্ষের উদ্বায়ী আখড়ায় পরিণত থাকে। তৃণমূল শাসনে বাংলার এই ‘বৈঠকখানাকরণ’ চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছয়। আধুনিকীকরণকে বিসর্জন দিয়ে স্থান করে নেয় আখ্যান পরিচালনা, চমক এবং বাঙালি পরিচয়কে শাসকদলের অনুগত বানানোর অপচেষ্টা।

শিবলিঙ্গে কন্ডোম পরানোই যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতাবাদের নতুন বিজ্ঞাপন, সেখানে ভাঙা পরিকাঠামোর মধ্যেও সরকারের সুবিধাপ্রাপ্ত কবি, শিক্ষাবিদ ও চলচ্চিত্র জগতের এলিটরা আরামে দিন কাটাচ্ছিলেন। আরজি কর মেডিকেল কলেজের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কিংবা সন্দেশখালির পৈশাচিকতায় এঁদের সুবিধাবাদী নীরবতা এবং শাসকের পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি মননশীল সমাজের অবক্ষয়কে নগ্ন করে দেয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও পদকের লোভে এঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বিকিয়ে দিয়েছেন।

তাঁরা কীভাবে আবার জনতার কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন, তা দেখার অপেক্ষা রইল। মূলত, বৈঠকখানা আর সিন্ডিকেট সংস্কৃতি আজ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ; একটি সমাজের বিবেককে বন্দি করে, অন্যটি মানুষের পকেট লুণ্ঠন করে। এই গভীর হতাশার অন্ধকার ফুঁড়ে আশার আলো ফিরিয়ে আনতে আজ প্রয়োজন দূরদর্শিতা, সাহস এবং রবীন্দ্রনাথের বর্ণিত সেই গভীর বিশ্বাসকে হৃদয়ে পুনরুজ্জীবিত করা: ‘সেই ডানাহীন পাখির মতো বিশ্বাস, যে ভোরের আলো ফোটার আগেই অন্ধকারের বুকে আলোর স্পন্দন টের পেয়ে গান গেয়ে ওঠে।’