বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা যখন তুঙ্গে এবং ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে চর্চা যখন চরমে, তখন বাইচুং ভুটিয়ার মতো কোনও মহা তারকা, কী বলছেন, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এ বার ভারতে বিশ্বকাপের টিভি ও ওটিটি সম্প্রচারে বিশেষজ্ঞদের প্যানেলে রয়েছেন ঠিকই, তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সংবাদমাধ্যমে এ বারের বিশ্বকাপ নিয়ে তিনি বললেন অনেক কিছু। যা বললেন, তুলে ধরা হল তার কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘এ বারও চ্যাম্পিয়ন হতে পারে আর্জেন্টিনা’
নিশ্চিতভাবেই মেসিদের খেতাব ধরে রাখার ক্ষমতা আছে। আমার মনে হয়, তারা গত বিশ্বকাপজয়ী দলের প্রায় পুরো মূল কাঠামোটাই ধরে রেখেছে। দি মারিয়া ছাড়া বাকি বেশিরভাগ খেলোয়াড় এখনও রয়েছে এবং আরও উন্নতি করেছে। বিশেষ করে আলভারেজ আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত খেলেছে।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিশ্বকাপটা উত্তর আমেরিকায় হচ্ছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর জন্য খুবই অনুকূল হবে। তাদের কোচ যেমন বলেছেন, তারা বিশ্বকাপ জিততে যাচ্ছে না, বরং বিশ্বকাপ রক্ষা করতে যাচ্ছে।
এই কথাটাই বলে দেয় দলটা কতটা আত্মবিশ্বাসী এবং শক্তিশালী।
দলটার ঐক্যও অসাধারণ। গত বিশ্বকাপে তারা মেসির জন্য খেলেছিল, এবারও মেসির জন্যই খেলবে। তবে দলের মধ্যে যে বন্ধন ও একাত্মতা রয়েছে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিল বা ফ্রান্সের মতো অন্য ফেবারিট দলগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, কোথাও যেন দলগত ঐক্যের একটু ঘাটতি রয়েছে। আর্জেন্টিনার সেই সমস্যা নেই। তারা সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল এবং বিশ্বকাপ ধরে রাখার জন্য তাদের কাছে মেসির মতো একজন অসাধারণ নেতা রয়েছে।
‘রোনাল্ডোর বয়স দশ বছর কম হলে পর্তুগালই চ্যাম্পিয়ন হত’
এই মুহূর্তে যদি পর্তুগালের দিকে তাকান, তাহলে সম্ভবত এটাই তাদের সেরা দল। তারা নেশনস লিগও জিতেছে এবং ভীষণ শক্তিশালী দল বলে মনে হচ্ছে। তাদের মাঝমাঠ বিশ্বের অন্যতম সেরা। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ দুর্দান্ত একটি প্রিমিয়ার লিগ মরসুম কাটিয়েছে এবং ওই বিভাগে তাদের একাধিক অসাধারণ ফুটবলার রয়েছে। তবে আক্রমণভাগে গোল করার ক্ষেত্রে আমার কিছুটা সংশয় রয়েছে। রোনাল্ডো যদি ১০ বছর ছোট হতো, আর এই দলটা যদি তাকে ঘিরে থাকত, তাহলে পর্তুগালই বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার হতো। এখনও তারা ফেবারিটদের মধ্যে রয়েছে, কিন্তু আক্রমণে সেই শেষ ধারটা যেন একটু কম।
লিওনেল মেসি বনাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো
পর্তুগাল অবশ্যই রোনাল্ডোর জন্য খেলবে। একমাত্র এই ট্রফিটা এখনও ওর হাতে ওঠেনি। তাই তাকে বিশ্বকাপ উপহার দেওয়াই হবে ওর সতীর্থদের লক্ষ্য। কিন্তু আর্জেন্টিনা শিবিরে মেসিকে ঘিরে যে অনুভূতি রয়েছে, সেটা আলাদা। ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক এবং আন্তরিক বলে মনে হয়। পর্তুগালের খেলোয়াড়রাও বলবে যে রোনাল্ডো তাদের কাছে সবকিছু এবং তারা তার জন্য জিততে চায়। আমি নিশ্চিত, ওর প্রাপ্ত সম্মানের কোনও অভাব নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে মেসির যে আবেগের সম্পর্ক, রোনাল্ডোর সঙ্গে তার সতীর্থদের আবেগের সম্পর্ক তার সমান কি না, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। এটা অবশ্যই আমার ব্যক্তিগত মত। যদি দুই দলকে তুলনা করেন, তাহলে দলগত স্পিরিট ও একাত্মতার দিক থেকে সেই অতিরিক্ত ১ শতাংশে এগিয়ে আর্জেন্টিনা।
‘রোনাল্ডোকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা উচিত হবে না’
রোনাল্ডোর মতো একজন খেলোয়াড়কে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা খুবই কঠিন হবে। আমার ধারনা, হয় সে খেলবে না, নয়তো প্রথম একাদশেই থাকবে। আমার মনে হয় বেশিরভাগ ম্যাচেই সে শুরু করবে, পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে তুলে নেওয়া যেতে পারে।রোনাল্ডোকে আমরা সবাই চিনি। সে বেঞ্চে বসে সুযোগের অপেক্ষা করার মানুষ নয়। সে সবসময় শুরু থেকেই খেলতে চাইবে। তার বয়স যাই হোক, ফর্ম যেমনই হোক, যদি রোনাল্ডো দলে থাকে, তাহলে সে প্রথম একাদশে থাকতে চাইবেই। আর আমার মনে হয় পর্তুগালও সেই ইচ্ছাকে সম্মান করবে।
মেসি, রোনাল্ডো ও নেইমারের ভূমিকা
আমার মনে হয়, মেসি ও রোনাল্ডো এখনও নিজেদের দলের প্রধান ভরসা থাকবে। নেইমারের পরিস্থিতি একটু আলাদা, কারণ সে এখনও চোটের সমস্যার সঙ্গে লড়ছে। আমি বিষয়টা বুঝতে পারি, কারণ আমার কেরিয়ারের শেষদিকে একই বয়সে আমারও কাফ মাসলের চোট হয়েছিল।
এই ধরনের চোট বারবার ফিরে আসতে পারে এবং শরীর থেকে অনেক শক্তি কেড়ে নেয়। তাই আমার মনে হয় টুর্নামেন্টের শুরুতে নেইমারের জন্য ব্যাপারটা কঠিন হবে এবং ব্রাজিলের হয়ে হয়তো সে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না।
মেসি ও রোনাল্ডো কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে। মেসির ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা। এমএলএসে খেলা এবং উত্তর আমেরিকার পরিবেশ তার জন্য খুব মানানসই। সে খেলার গতি কমাতে পারে, বলের দখল ধরে রাখতে পারে, সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং আরও গভীর জায়গা থেকে ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অন্যদিকে রোনাল্ডো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ফুটবলার। পর্তুগাল তার জন্য সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করবে এবং তার শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগাবে। সে হয়তো মেসির মতো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করবে না, কিন্তু গোল করার জায়গায় কীভাবে পৌঁছতে হয়, সেটা সে এখনও খুব ভালো জানে”।
ডার্ক হর্স’ ব্রাজিল!
আসলে আমি এই বিশ্বকাপের ডার্ক হর্স হিসেবে ব্রাজিলকেই দেখছি। সাধারণত বিশ্বকাপের কথা উঠলেই ব্রাজিল ফেবারিটদের মধ্যে থাকে। কিন্তু এবার ওদের নিয়ে প্রত্যাশা ততটা বেশি নয়। ওদের খুব ভালো দল রয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, তাদের কোচ কার্লো আনসেলোত্তি— যিনি ফুটবলের অন্যতম সেরা ম্যান-ম্যানেজার। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো খেলোয়াড়রা স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেললে আরও ভালো করে। এই দলের জন্য আনসেলোত্তি একেবারে উপযুক্ত কোচ। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল, ব্রাজিল এবার অনেক কম চাপ নিয়ে বিশ্বকাপে নামছে। আগের টুর্নামেন্টগুলোতে সবসময় একটা প্রত্যাশা থাকত যে তাদের জিততেই হবে। এবার সম্ভবত বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই তাদের শীর্ষ ছয় ফেবারিটের মধ্যেও রাখবেন না। আর সেটাই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে।




