• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 11 June, 2026

কাজের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় মহিলারা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে

ভারতের সংগঠিত ক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতি কমছে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

শোভনলাল চক্রবর্তী

দক্ষতা বা বেতন নয়, পরিবারের মানুষের দেখাশোনা করতে গিয়েই কাজের জগতে অধিকাংশ মহিলা পুরুষদের থেকে পিছিয়ে রয়েছেন বলে উঠে এল সমীক্ষায়। চাকরি সংক্রান্ত পোর্টাল ইন্ডিড-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতে ৮৩%, অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে আট জনের বেশি মহিলা এই কারণে কাজের আবেদন করেন না। পরিবারের বাকি সদস্যেরাও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁদের কর্মসংস্থানের উপরে মহিলাদের মতো এতটা প্রভাব পড়ে না। বেঙ্গালুরু, কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চল, হায়দরাবাদ, চেন্নাই ও পুণেতে এই সমীক্ষা চালিয়েছিল ইন্ডিড। জবাব নেওয়া হয়েছে ১১৪১ জনের থেকে। যাঁদের মধ্যে ছিলেন সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, আপাতত কাজের দুনিয়া থেকে বিরতি নিয়েছেন অথবা বিরতির পরে ফিরে এসেছেন এমন মহিলা কর্মী। সেই সমীক্ষা বলছে, চাকরি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ৫৩% মহিলা কাজের সময়কে মূল নির্ধারক হিসেবে তুলে ধরেছেন। বাড়ি থেকে (কিছু দিন অফিস গিয়ে) কাজে আগ্রহী ৪৮%। অফিস যাওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়েছেন ৫১%। অফিসে যেতে হলে সন্তান পালনের সঙ্গে ওই কাজ সামলানো কঠিন হয়, জানিয়েছেন তাঁরা।

রিপোর্ট বলছে, কাজ ও পরিবারের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে কম বেতন নিতে রাজি ৪৫% মহিলা বা তা বিবেচনা করবেন ৩৪%। আসলে সংসার সামলানোর দায়িত্ব সকলের মধ্যে ভাগ হয় ঠিকই। কিন্তু কাজের জগতে মেয়েদের যোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। মহিলারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু পরিবারের দায়িত্বের কথা ভেবে কাজ বাছাই করেন বুঝেশুনে। ফলে যে সমস্ত সংস্থা সেই পরিবেশ দেয়, তারা মহিলা কর্মীদের ধরে রাখতে পারে। চারটি নয়া শ্রম বিধি সারা দেশে চালু হয়েছে। আগের আইনগুলির মতো, নয়া বিধিতেও নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ, সমান কাজের জন্য সকলকে সমান মজুরি দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু, যদি না উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, এই নিয়ম কার্যকর করা অসম্ভব। সেই বিধিব্যবস্থার প্রয়োজন তীব্র— নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন এমন মহিলাকর্মীদের ৫৭ শতাংশের কোনও লিখিত নিয়োগপত্র নেই।

পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা মাসে গড়ে ৫৬৬৪ টাকা কম পান। স্নাতকোত্তীর্ণ মেয়েদের নিয়োগ করছে যে সব ক্ষেত্র— প্রধানত তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য— সর্বত্র এই ছবি দেখা যাচ্ছে। নানা সমীক্ষা দেখিয়েছে যে, সম্মানজনক পদ ও বেতন পাওয়ার আশা না থাকায় বহু উচ্চশিক্ষিত মেয়ে রোজগারের চেষ্টা ছেড়ে বেতনহীন গৃহকাজ বেছে নিচ্ছেন, যা মানবসম্পদের অপচয়। স্বল্পবিত্ত পরিবারগুলিতেও এই বৈষম্য প্রকাশ পাচ্ছে। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রিপোর্ট (স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া, ২০২৬) দেখাচ্ছে, ২০ থেকে ২৯ বছরের পুরুষদের মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োগ যেখানে ক্রমাগত কমছে, সেখানে ওই বয়সের মহিলাদের মধ্যে কৃষিতে নিযুক্তির হার ২০১১ অবধি কমার পরে আবার বাড়তে শুরু করেছে। যার অর্থ, শ্রমজীবী তরুণীরা শিল্প-পরিষেবা ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাজ পাচ্ছেন না।

বিষয়টি কেবল অর্থনীতির নয়, রাজনীতিরও। লিঙ্গবৈষম্য ভারতে সম্পদ-বঞ্চনার অন্যতম অক্ষ— জাতপাত ও আর্থিক শ্রেণির মতোই। সরকারি ক্ষেত্রেও মহিলাকর্মীদের প্রতি এই বৈষম্য পুরোমাত্রায়— সরকারি হাসপাতালের নার্স বা আশা-অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের বেতন-কাঠামো দেখলেই স্পষ্ট হয় দায়িত্ব, দক্ষতা বা শ্রমের সঙ্গে বেতনের সামঞ্জস্য নেই, সম্পর্ক রয়েছে লিঙ্গপরিচয়ের সঙ্গে। সরকারি ও বেসরকারি, দু’ক্ষেত্রেই শিক্ষিত, দক্ষ মেয়েদের জন্য উপযুক্ত কাজ তৈরি করতে হবে, দিতে হবে বৈষম্যহীন কর্মস্থল, যথাযোগ্য বেতন। বারে বারেই বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, যন্ত্রমেধার প্রচলনের ফলে যত চাকরি খোয়া যাবে, তার সিংহভাগই মেয়েদের। ২০২৩ সালে, জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর আদিপর্বে, গোল্ডম্যান স্যাকস একটি গবেষণা করে দেখেছিল যে, প্রায় ৮০% মহিলার চাকরি যন্ত্রমেধার প্রচলনের কারণে বিপন্ন হতে পারে— সেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে অনুপাতটি ৫০ শতাংশের আশেপাশে।

ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের গবেষণাপত্রেও উঠে এসেছে একই আশঙ্কা— যন্ত্রমেধার হাতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি। না, যন্ত্রমেধার কোনও বিশেষ নারীবিদ্বেষ নেই। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, কর্মী-নিয়োগের প্রক্রিয়ায় যখন যন্ত্রমেধা ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন তার ট্রেনিংয়ের মধ্যে ঢুকে পড়া পক্ষপাত সেই প্রক্রিয়াকে মেয়েদের পক্ষে কিঞ্চিৎ প্রতিকূল করে তুলছে। যদিও মূল সমস্যা সেটা নয়। প্রায় দু’বছরের ব্যবধানে— এবং, যন্ত্রমেধার মতো অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দু’বছর নেহাত কম ব্যবধান নয়— দু’টি সমীক্ষার ফলাফলই কার্যত এক কথা বলছে: শিল্পক্ষেত্রে বিগত তিনটি বিপ্লবের সঙ্গে যন্ত্রমেধা-কেন্দ্রিক চতুর্থ বিপ্লবের চরিত্রগত ফারাকই এই বৈষম্যের কারণ। পূর্ববর্তী প্রতিটি পর্যায়েই যান্ত্রিক উদ্ভাবনে কাজ হারিয়েছিলেন ব্লু-কলার ওয়ার্কার বা শ্রমজীবী মানুষ। কৃত্রিম মেধা চাকরি কাড়ছে হোয়াইট কলার ওয়ার্কারদের। তাও সকলের নয়— হোয়াইট কলার চাকরির মধ্যে যেগুলির কাজের চরিত্র মূলত যান্ত্রিক, যেখানে মানুষের বিশিষ্ট মেধার প্রয়োগের অবকাশ কম, যন্ত্রমেধার কবলে চলে যাচ্ছে সে কাজগুলিই। গোটা দুনিয়াতেই— বিশেষত উন্নত দুনিয়ায়— সে কাজগুলিতে মেয়েদের উপস্থিতি ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে, মেয়েদের চাকরিই বেশি বিপন্ন।

এই কথাটিতে একটি আপাত-ব্যাখ্যা মেলে বটে, কিন্তু এক বিশেষ গোত্রের কাজেই মেয়েদের উপস্থিতি এত নিবিড় কেন, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। ব্যাপারটা সমাপতন নয়। অন্তত, ক্লডিয়া গোল্ডিনের নোবেল-জয়ের পরে এই প্রশ্নটির গভীরতর উত্তরের হদিস না রাখা অন্যায় হবে। ২০২৩ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী গোল্ডিন দেখিয়েছিলেন, মেয়েদের কাজের বাজার প্রভাবিত হয় এমন কিছু বিষয় দ্বারা, মূলধারার অর্থশাস্ত্র যেগুলিকে কখনও কাজের বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব হিসাবে বিবেচনাই করেনি। যেমন, মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগের মাত্রা বহুলাংশে নির্ধারিত হয় তাদের মায়েদের প্রজন্মের অর্থনৈতিক প্রত্যাশার দ্বারা। মায়েদের প্রজন্ম যদি অভিজ্ঞতালব্ধ কারণে বিশ্বাস করে যে, বিয়ের পর মেয়েরা আর চাকরি করবে না, তা হলে স্বভাবতই পরিবারের পরিসরে মেয়েদের শিক্ষাখাতে কম বিনিয়োগ করা হবে। প্রাক্‌-যৌবনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলে কোনও মেয়ে তার গোটা কর্মজীবনেই পিছিয়ে থাকে।

আবার, সন্তানধারণ ও তার প্রতিপালনের দায়িত্ব মেয়েদের ঘাড়েই বর্তাবে, ফলে পেশাদার জীবনের এক মোক্ষম সময়ে চাকরি তাদের অখণ্ড মনোযোগ পাবে না, এই আশঙ্কায় নিয়োগকর্তারা মেয়েদের গুরুদায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে চান। এমন বিবিধ কারণে মেয়েদের চাকরি সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে নিচু স্তরের হোয়াইট কলার কাজে— ঐতিহাসিক ভাবেই গায়েগতরে খাটুনির কাজে মেয়েরা ব্রাত্য, আর উচ্চদক্ষতার কাজ থেকে তাদের ব্যবস্থাগত ভাবে দূরে রাখা হয়। তারা এমন কাজ করতে বাধ্য হয়, আজ যন্ত্রমেধা যে কাজ বিনা সমস্যায় রপ্ত করে ফেলতে পারছে।এই সুগভীর ও কাঠামোগত সমস্যা থেকে মেয়েরা কীভাবে নিস্তার পেতে পারে, সেই বড় প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার আগে একটা অন্য কথা খেয়াল করা ভাল— এই উদাহরণটি দেখিয়ে দেয় যে, কী ভাবে অতীতের অনপনেয় ছাপ থেকে যায় সুদূর ভবিষ্যতের গায়ে। বিশ শতকের প্রথম পর্বে যে মহিলারা বেছে নিয়েছিলেন সওদাগরি অফিসে টাইপিস্টের কাজ, এবং পরবর্তী কালে নিজেদের অভিজ্ঞতার নিরিখে স্থির করেছিলেন যে, কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রেও টেলিফোন অপারেটরের চাকরির জন্য প্রস্তুত হওয়াই ভাল, যন্ত্রমেধা তাঁদের সুদূরতম কল্পনার দিগন্তরেখাতেও ছিল না।

ভারতের সংগঠিত ক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতি কমছে। জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত ২৬৪৭টি বাণিজ্যিক সংস্থার প্রায় অর্ধেক সংস্থায় দায়িত্বপূর্ণ আধিকারিকদের পদে কোনও মহিলা নেই। নেতৃত্বের স্থানে একাধিক মহিলা রয়েছেন, এমন সংস্থা মাত্র ১০ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি ক্ষেত্রে নতুন নিযুক্তির ৩৩ শতাংশ মহিলা। যাঁরা টিকে যান, তাঁদের অধিকাংশই নীচের স্তরে, তুলনায় স্বল্প বেতনের কাজগুলি করেন। আঠারো হাজার টাকার বেশি বেতনে কর্মরতদের মধ্যে মেয়েদের অনুপাত ২০২০-২১-এও ছিল ২১%, ২০২৪-২৫-এ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২%। তার চেয়ে কম বেতনে কর্মরতদের মধ্যে মেয়েদের হার ওই সময়কালে ১৯% থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩%।
কিন্তু মোটের উপরে ওই সময়কালে সংগঠিত ক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যা এক শতাংশ-বিন্দু কমে দাঁড়িয়েছে ১৮%। এই ছবি উদ্বেগজনক।

ভারতে আজ স্নাতক-উত্তীর্ণদের প্রায় অর্ধেকই মেয়ে, উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের উপস্থিতি বাড়ছে। তা হলে সংগঠিত ক্ষেত্রের চাকরি, বিশেষত দায়িত্বপূর্ণ পদ, উচ্চবেতনের কাজগুলি কেন মেয়েদের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে? এমনকি, মেয়েদের সংখ্যা কমছে কেন? এই প্রশ্নগুলি সহজে সামনে আনতে চায় না সরকার বা শিল্পমহল, কোনও পক্ষই। বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরতদের একটা বড় অংশকে ‘ইপিএফ’-এ নথিভুক্ত করছে নিয়োগকারীরা। তাই তাঁরা সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী বলে গণ্য হচ্ছেন সরকারের নথিতে। বস্তুত কাজের শর্ত, সময়সীমা, নিরাপত্তা প্রভৃতির বিচারে তাঁদের অবস্থা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের থেকে আলাদা নয়। এই সঙ্কটের মুখোমুখি লিঙ্গ-নির্বিশেষে সব কর্মী, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে যুক্ত হয় বৈষম্য, বঞ্চনা, অবমাননার বাড়তি মাত্রা।