পার্থ সারথি চৌধুরী
আনন্দ কেন্টিশ কুমারস্বামী (১৮৭৭–১৯৪৭) ভারতীয় শিল্পের একজন অতুলনীয় পথিকৃৎ, তীক্ষ্ণধী ইতিহাসবিদ এবং পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রধান ব্যাখ্যাকার হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। ১৮৭৭ সালের ২২ আগস্ট সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) কলম্বোতে জন্ম কুমারস্বামীর। তিনি ছিলেন এক গভীর সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক। সিংহলে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী এক প্রথিতযশা ভারতীয় পিতা স্যার মুতু কুমারস্বামী এবং কেন্টের ইংরেজ মা এলিজাবেথ ক্লে বিবির সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর এই দ্বৈত উত্তরাধিকারের মাধ্যমে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কুমারস্বামীর জীবন ও কর্ম রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের সেই বিখ্যাত উক্তির— ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কখনোই মিলতে পারে না’— একটি জীবন্ত প্রতিবাদ হিসেবে কাজ করেছে। শৈশব থেকেই দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এই উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে এক অনন্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, এই দুই জগতের মিলনে উভয় পক্ষই গভীরভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে। তিনি কেবল অন্তরে ভারতীয় ছিলেন না, বরং তিনি একজন প্রকৃত বিশ্বজনীন মানুষ, যিনি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীর মহিমা ও সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন।
একজন দক্ষ শিল্প-ব্যাখ্যাকার হয়ে ওঠার পথে কুমারস্বামীর যাত্রা শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানের কঠোর অনুশাসনের মধ্য দিয়ে। ১৮৭৯ সালে তাঁর পিতা মারা যান, যখন তরুণ আনন্দ তাঁর মায়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডে ছিলেন। ফলে তাঁর মা স্বদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। কুমারস্বামী ইংল্যান্ডের ওয়াইক্লিফ কলেজ এবং পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন। সেখান থেকে তিনি ভূতত্ত্বে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজ্ঞানের এই সুতীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণের নৈপুণ্যই পরবর্তীকালে তাঁকে শিল্পের সূক্ষ্ম বিচার ও মূল্যায়নে সাহায্য করেছিল।
জন্মভূমিতে ফিরে তিনি ১৯০৩ থেকে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত সিংহলের খনিজ জরিপ বিভাগের (Mineralogical Survey of Ceylon) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ভূতাত্ত্বিক জরিপ অত্যন্ত সফল ছিল এবং তিনি ‘থোরিয়ানাইট’ নামক একটি মূল্যবান নতুন খনিজ আবিষ্কার করেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর তাঁর গবেষণাপত্রটি তাঁকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি এনে দেয়। তবে এই বৈজ্ঞানিক অভিযান তাঁকে ভূতাত্ত্বিক আবিষ্কারের চেয়েও অনেক বড় কিছু উপহার দিয়েছিল; এটি ছিল তাঁর গভীর সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রধান অনুঘটক। ভূমি জরিপ করার সময় কুমারস্বামী সিংহল ও ভারতের অবহেলিত ঐতিহ্যবাহী শিল্প, স্থাপত্য ও প্রাচীন কারুশিল্পের সন্ধান পান। এই আবিষ্কারে বিমোহিত হয়ে তিনি দ্রুত তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ ভূতত্ত্ব থেকে শিল্প ও শিল্প-ইতিহাসের দিকে স্থানান্তরিত করেন।
এক নতুন আবেগ ও স্বদেশি চেতনায় চালিত হয়ে কুমারস্বামী ১৯১০ ও ১৯১১ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক ভ্রমণ করেন। এই সময়ে তিনি ঐতিহ্যবাহী শিল্প, বিশেষ করে রাজপুত ও পাহাড়ি চিত্রকলার এক অসাধারণ ও বিশ্বমানের সংগ্রহ গড়ে তোলেন। ওই একই সময়ে তিনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বেঙ্গল স্কুল অফ আর্টের অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হন। তাঁর পাণ্ডিত্য বিবেচনা করে ১৯১১ সালে এলাহাবাদে আয়োজিত ‘ইউনাইটেড প্রভিন্স এগজিবিশন’-এর শিল্প বিভাগের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়।
তরুণ ও আদর্শবাদী কুমারস্বামী ভারতীয় শিল্পের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘জাতীয় জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি তাঁর অমূল্য সংগ্রহটি দান করার প্রস্তাব নিয়ে ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঔপনিবেশিক মানসিকতায় আচ্ছন্ন তৎকালীন ভারতে কেউ তাঁর এই মহৎ প্রস্তাব গ্রহণ করতে এগিয়ে আসেনি। পরিবর্তে, তাঁর কাজের স্বীকৃতি এল পশ্চিম থেকে। ১৯১৭ সালে বোস্টনের ‘মিউজিয়াম অফ ফাইন আর্টস’-এর পৃষ্ঠপোষক
ড. ডেনম্যান ডব্লিউ রস তাঁর সংগ্রহটি ওই প্রতিষ্ঠানকে দান করেন। কুমারস্বামীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং ভারতীয়, পারস্য ও মুসলিম শিল্পকলার কিউরেটর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তাঁর এই অক্লান্ত পরিশ্রমে বোস্টন মিউজিয়াম ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি এই জাদুঘরের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কুমারস্বামীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান ছিল বিস্ময়কর। তিনি ৩৫টি বই এবং প্রায় ৫০০টি গবেষণা প্রবন্ধ ও পর্যালোচনা লিখেছেন। তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্য শিল্পকলা, স্থাপত্য, দর্শন, নন্দনতত্ত্ব থেকে শুরু করে ধর্মতত্ত্ব, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং মুদ্রাতত্ত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সংস্কৃত, তামিল, পালি-র মতো প্রাচীন ভাষার পাশাপাশি ফরাসি ও জার্মান প্রভৃতি আধুনিক ভাষাতেও তিনি ছিলেন
সমান পারদর্শী।
পণ্ডিতরা তাঁর কর্মজীবনকে প্রধানত দুটি পর্বে ভাগ করেন—
প্রথম পর্ব (১৯৩২ পর্যন্ত): এই সময়ে তিনি মূলত একজন সমালোচনামূলক ও তথ্যনির্ভর শিল্প-ইতিহাসবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। এই সময়ের কালজয়ী কাজের মধ্যে রয়েছে ‘রাজপুত পেইন্টিং’ (১৯১৬), যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো মোগল এবং রাজপুত চিত্রকলার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করেন। এছাড়াও ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান অ্যান্ড ইন্দোনেশিয়ান আর্ট’ (১৯২৭) এবং ‘দ্য ড্যান্স অফ শিবা’ (১৯১২) তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
দ্বিতীয় পর্ব (১৯৩২-এর পর): এই পর্বে তাঁর কাজ অধিবিদ্যা (Metaphysics) ও সনাতন দর্শনের (Perennial Philosophy) দিকে মোড় নেয়। ‘দ্য ট্রান্সফরমেশন অফ নেচার ইন আর্ট’ (১৯৩৪) এবং ‘টাইম অ্যান্ড ইটার্নিটি’ (১৯৪৭)-এর মতো গ্রন্থে তিনি বৈপ্লবিক তত্ত্ব দেন যে: শিল্প, বিজ্ঞান এবং ধর্ম বিচ্ছিন্ন কোনো ক্ষেত্র নয়, বরং এগুলি সংস্কৃতি ও সভ্যতার তিনটি পরিপূরক শাখা।
উইলিয়াম মরিসের একজন স্বঘোষিত শিষ্য হিসেবে কুমারস্বামী পাশ্চাত্যের শিল্পায়ন ও ঔপনিবেশিকতার আত্মবিনাশী প্রভাবের প্রতি গভীর ঘৃণা পোষণ করতেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাঁর ঐতিহ্যের প্রতিরক্ষা কেবল অতীতপ্রীতি ছিল না; তিনি বিশ্বাস করতেন অতীতের শিল্পবস্তুগুলো আধ্যাত্মিক শূন্যতায় ভোগা আধুনিক সমাজকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তিনি কেবল শিল্পের বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং কারুশিল্পীদের সামাজিক মর্যাদা এবং তাঁদের সৃজনশীলতার স্বাধীনতার পক্ষেও জোরালো সওয়াল করেছিলেন।
কুমারস্বামীকে প্রায়ই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং মহাত্মা গান্ধীর মতো শ্রেষ্ঠ ভারতীয় মনীষীদের সঙ্গে তুলনা করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের মতো তিনিও শিল্পকে ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতেন এবং বুদ্ধমূর্তির গ্রিক উৎস সংক্রান্ত তত্ত্বকে তথ্যপ্রমাণ সহকারে খণ্ডন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় সখ্য ছিল এবং যন্ত্রসভ্যতার চাপে মানবতার স্বাধীনতা হারানোর বিষয়ে তিনি কবির উদ্বেগেরই প্রতিধ্বনি করেছিলেন। ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যা অর্জন করেছিলেন, শিল্প-ইতিহাসের ক্ষেত্রে কুমারস্বামী নিপুণভাবে তাই অর্জন করেছিলেন।
জীবনের বেশিরভাগ সময় ভারতের বাইরে বসবাস করলেও কুমারস্বামী তাঁর সময়ের অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে অন্তরে বেশি ভারতীয় ছিলেন। তাঁর চিরন্তন বার্তা ছিল: ‘নিজেদের মতো হও’ (Be yourselves)। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এক বিশ্বজনীন মানবতার প্রবক্তা, যিনি সমস্ত ধর্মের উৎসকে এক বলে মানতেন। এক বিশ্বকোষীয় মন ও নির্ভুল লেখনীর অধিকারী আনন্দ কুমারস্বামী ভারতীয় শিল্পের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন। তিনি এমন এক ‘ক্রান্তদর্শী’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন, যিনি ভারতীয় ঐতিহ্যের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার পথ তৈরি করে গেছেন।




