• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 4 June, 2026

মার্কিন শুল্ক-রাজনীতি

প্রথমেই নজরে আসে, ইরান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয়। প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে বলে অনুমান

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যনীতির কেন্দ্রে যে শুল্ক নীতি রয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হচ্ছে, এই শুল্ক আর কেবল অর্থনৈতিক হাতিয়ার নয়— এটি এখন কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির এক কার্যকর অস্ত্র। ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ, সব ক্ষেত্রেই একই কৌশল লক্ষণীয়– চাপ সৃষ্টি করে ছাড় আদায়।

প্রথমেই নজরে আসে, ইরান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয়। প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে বলে অনুমান। অন্যদিকে, তথাকথিত ‘পারস্পরিক শুল্ক’ থেকে আয় হলেও, সেই অর্থের একটি বড় অংশ ফেরত দিতে হতে পারে— কারণ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এই শুল্ককে বেআইনি বলেছে। অর্থাৎ, শুল্কনীতি থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক লাভ বাস্তবে অনেকটাই অনিশ্চিত। তবুও ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আরোপে এতটাই আগ্রহী যে, নতুন করে আরও বহু দেশের উপর শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের উপর সম্ভাব্য ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অভিযোগ— ভারত নাকি ‘জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত’ পণ্যের বাণিজ্য রুখতে যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই স্বীকার করছে, ভারতের তৈরি মার্কিনমুখী পণ্যে এমন কোনও অভিযোগ নেই। বরং অভিযোগ এই যে, ভারত অন্য দেশ থেকে এমন পণ্য আমদানি করছে। প্রশ্ন উঠছে— একটি দেশের আমদানি নীতির দায় অন্য দেশের উপর চাপানো কতটা যুক্তিযুক্ত?

এই যুক্তি যে যথেষ্ট দুর্বল, তা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিটি দেশ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি-রপ্তানি নীতি নির্ধারণ করে। সেখানে তৃতীয় পক্ষের নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে শুল্ক আরোপ করা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হয়। বিশেষত, যখন দেখা যায় কিছু নির্দিষ্ট পণ্য— যেমন বিরল ধাতু, ওষুধ, বিমান যন্ত্রাংশ— এই ‘জোরপূর্বক শ্রম’ সংক্রান্ত শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, যেখানে আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থ জড়িত, সেখানে নৈতিকতার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে যায়।

এখানেই মার্কিন নীতির দ্বিচারিতা প্রকট। একদিকে শ্রমিকদের সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনমতো সেই নীতিই শিথিল করা হচ্ছে। ফলে এই শুল্ক-নীতি প্রকৃতপক্ষে শ্রমিককল্যাণের চেয়ে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই প্রতীয়মান।আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই শুল্ক-হুমকির সময়কাল। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে— যাকে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ‘কমা ও ফুলস্টপের স্তর’ বলে উল্লেখ করেছেন। এমন সময়ে নতুন শুল্কের হুমকি স্পষ্টতই চাপ সৃষ্টির কৌশল। লক্ষ্য— ভারতের কাছ থেকে আরও কিছু ছাড় আদায় করা।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান কী হওয়া উচিত? প্রথমত, এই দুই বিষয়— শুল্ক তদন্ত (সেকশন ৩০১) এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি— আলাদা রাখা জরুরি। একটির সঙ্গে অন্যটির মিশ্রণ হলে আলোচনা জটিল হবে এবং ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন হলে শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শুনানির আবেদন করা উচিত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মেনেই এই লড়াই চালানো প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভারতকে নিজের অবস্থানে অনড় থাকতে হবে। সাময়িক আর্থিক চাপের ভয়ে যদি নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় চাপের পথ খুলে দেবে। বরং নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত বাণিজ্যনীতির পক্ষে দৃঢ় থাকা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্য আর কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়— এটি ভূ-রাজনীতি, কূটনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের অংশ। সেই বাস্তবতায় ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশকে সতর্ক ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। মার্কিন শুল্কনীতি যে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার— তা স্পষ্ট।

মনে রাখতে হবে, প্রশ্নটি কেবল শুল্কের নয়— এটি নীতির, আত্মসম্মানের এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমতার প্রশ্ন। ভারতের উচিত সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।