• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 2 June, 2026

ভারত-মায়ানমার সম্পর্ক

মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক একদিকে যেমন নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে

ভারত ও মায়ানমারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংলাপ আবার প্রমাণ করল যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব কতটা জটিল। মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক একদিকে যেমন নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেমনি মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের অবস্থান সম্পর্কেও ভাবার অবকাশ রয়েছে।
প্রথমত, ভারতের প্রধান উদ্বেগ যে নিরাপত্তা— তা এই বৈঠকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলির উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই মায়ানমারের ভূখণ্ডে একটি বড় সমস্যা। সেই প্রেক্ষিতে মায়ানমারের তরফে আশ্বাস যে, তাদের ভূখণ্ড ভারতবিরোধী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-মায়ানমার সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সামরিক বা কৌশলগত দিক থেকে নয়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই আশ্বাসের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। কারণ মায়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটি কার্যত গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দ্বিতীয়ত, এই বৈঠক ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে এনেছে— ‘প্র্যাগম্যাটিক এনগেজমেন্ট’ বা বাস্তববাদী যোগাযোগ। ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষপাতী নয়। বরং সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান খোঁজার পক্ষে। এই অবস্থান একদিকে যেমন কৌশলগতভাবে যুক্তিযুক্ত— বিশেষত চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষিতে— অন্যদিকে একটি নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে আসে ।
মায়ানমারের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চি এখনও বন্দি। তাঁর মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এই বিষয়টি উত্থাপন করেছে ঠিকই, কিন্তু তা আলোচনার অংশ হিসেবেই। এটি কোনও কড়া কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি নমনীয় ও সতর্ক বার্তা। প্রশ্ন হল, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের কি আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে?
তৃতীয়ত, পরিকাঠামোগত প্রকল্পগুলির প্রসঙ্গ এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প এবং ভারত-মায়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপাক্ষিক মহাসড়ক প্রকল্প— দুটিই ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মূল স্তম্ভ। এই প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে, যা বাণিজ্য ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। কিন্তু মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এই প্রকল্পগুলিকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখেছে। ফলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়— এই বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে।
চতুর্থত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য মায়ানমারের সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব একদিকে যেমন সহযোগিতার নতুন দিক খুলে দেয়, অন্যদিকে এটি বিতর্কও সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, যে সেনাবাহিনী নিজের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত, তাদের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার জন্য প্রস্তুত করা কতটা যুক্তিযুক্ত— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সবমিলিয়ে ভারত এক কঠিন ভারসাম্যের খেলায় নেমেছে। একদিকে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কৌশল ও অর্থনৈতিক স্বার্থ; অন্যদিকে রয়েছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নৈতিক অবস্থান। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন সহজ নয়। তবে ভারতের উচিত, বাস্তবতার সঙ্গে আপস করলেও নৈতিকতার প্রশ্নে সম্পূর্ণ নীরব না থাকা। সংলাপের পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে আরও জোরালো ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। মায়ানমারের সংকট কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। সেই প্রেক্ষিতে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।