• facebook
  • twitter
Monday, 1 June, 2026

কৃষির সংকট

চাষাবাদ বা কৃষিকর্ম এখন আর অনেকের চোখে সম্মানের পেশা বলে মনে হচ্ছে না

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভারতে কৃষির কথা উঠলেই আমরা সাধারণত ফসল নষ্ট হওয়া, ঋণের বোঝা বা বাজারদরের ওঠানামার কথা বলি। কিন্তু এর আড়ালে আরও একটা বড় পরিবর্তন চুপচাপ ঘটে চলেছে— চাষাবাদ বা কৃষিকর্ম এখন আর অনেকের চোখে সম্মানের পেশা বলে মনে হচ্ছে না।একসময় গ্রামবাংলার খুব চেনা একটা স্বপ্ন ছিল। বাবা-মা মাঠে খেটে মরবেন, যাতে ছেলে-মেয়েরা সেই কষ্টের জীবন থেকে বেরিয়ে ‘ভালো’ কিছু করতে পারে। সরকারি চাকরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং বা আইটি— এসবই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের চিহ্ন। কারণ এগুলোর অর্থ ছিল কৃষির অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি। ধীরে ধীরে চাষাবাদ শুধু কঠিন নয়, অনেকের কাছে অপ্রিয় পেশা হয়ে উঠেছে।
এই বদলের পেছনে খুব বাস্তব কারণ আছে। আজকের দিনে একজন কৃষককে অনেকটাই ব্যবসায়ীর মতো কাজ করতে হয়, কিন্তু তাঁর হাতে ব্যবসায়ীর মতো নিরাপত্তা নেই। বৃষ্টি ঠিকমতো হবে কি না, সার-বীজের দাম কত বাড়বে, বাজারে কী দাম পাওয়া যাবে, মাঝখানে দালাল কী করবে— এ সবকিছুর উপর তাঁর আয় নির্ভর করে। অথচ ক্ষতি হলে তা সামলানোর মতো পুঁজি বা সুরক্ষা খুব কমই থাকে। তাই ছেলেমেয়েদের অন্য পেশায় যেতে বলাটা অস্বাভাবিক নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু এর ফলটা এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। দেশে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে চাষ করার মতো মানুষই কমে যেতে পারে। যাঁরা এখন চাষ করছেন, তাঁদের গড় বয়স বাড়ছে। আর তরুণরা শহরে চলে যাচ্ছে— কেউ সার্ভিস সেক্টরে, কেউ ডেলিভারি বা লজিস্টিকসে, কেউ ডিজিটাল কাজের দিকে। এমনকি যারা কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করছে, তারাও অনেক সময় মাঠে নামতে চায় না। তারা চায় কর্পোরেট চাকরি বা সরকারি পোস্ট। অর্থাৎ কৃষি শেখা হচ্ছে, কিন্তু করা হচ্ছে না।
এখানেই একটা বড় দ্বন্দ্ব সামনে আসে। একদিকে আমরা কৃষকদের নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলি, তাঁদের সম্মান জানাই। কিন্তু অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি এমন যে, চাষ করে স্থায়ী আয় বা সম্মান— দুটোরই নিশ্চয়তা কমে যাচ্ছে। ঋণ মকুব বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে যতই আলোচনা হোক, এগুলো এই সমস্যার মূলে পৌঁছতে পারছে না।
আজকের যুবসমাজ শুধু বেশি টাকা চায় না— তারা চায় নিশ্চিন্ত জীবন, স্থায়ী আয় আর সমাজে একটা স্বীকৃতি। কৃষিক্ষেত্র এখন সেই তিনটেই দিতে পারছে না বলেই তারা সরে যাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। চাষাবাদে নতুন প্রজন্ম না এলে খাদ্যনিরাপত্তা দুর্বল হবে, গ্রামের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে, আর পরিবেশ রক্ষার পুরনো জ্ঞানও হারিয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে বড় সংস্থার হাতে জমি চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।এই অবস্থায় শুধু আবেগ দিয়ে ‘গ্রামে ফিরে চাষ করো’ বললে কাজ হবে না। চাষাবাদকে সত্যিই টেকসই আর আকর্ষণীয় করতে হবে। তার জন্য দরকার আধুনিক প্রযুক্তি, ভালো সেচব্যবস্থা, ফসল সংরক্ষণ, নির্ভরযোগ্য বাজার, যেখানে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন। সঙ্গে গ্রামে স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর ইন্টারনেটের সুবিধাও বাড়াতে হবে।সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, কৃষককে শুধু সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।
তাঁকে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে সম্মান দিতে হবে। তাঁর হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আর বাজারে শক্ত অবস্থান না থাকলে পরিস্থিতি বদলাবে না।আজকের তরুণরা চাষ ছেড়ে দিচ্ছে— এটা কোনও অবজ্ঞা নয়। তারা যা দেখছে, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আসল চিন্তার কথা হল, অনেক কৃষক নিজেও এখন বিশ্বাস করছেন না যে, তাঁর পেশা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে। এই বিশ্বাসটাই যদি ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে কৃষির সংকট আরও গভীর হবে।

Advertisement

Advertisement