• facebook
  • twitter
Wednesday, 27 May, 2026

তিনটি ‘এফ’-এর সংকট

বৃহৎ জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার— এই সবই ভারতের পক্ষে কাজ করছে

ভারতের অর্থনীতি নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, জনমানসের ওপরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তিনটি ‘এফ’— ফুয়েল, ফার্টিলাইজার এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ— এই ধারণাটি মূলত বর্তমান আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে ভারতের অর্থনীতির দুর্বল ও সংবেদনশীল দিকগুলিকে চিহ্নিত করছে।
প্রথমত, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটটি বোঝা জরুরি। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার বা ফার্টিলাইজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এই দুই ক্ষেত্রেই ভারত আমদানিনির্ভর, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে সোনার দাম বৃদ্ধি এবং তার আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে সরকার যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে, তা অমূলক নয়।
তবে এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে— অর্থনৈতিক আস্থার প্রশ্ন। অর্থমন্ত্রী যে ভয় বা আতঙ্ক সৃষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনীতিতে আস্থা একটি বড় উপাদান। যদি বিনিয়োগকারী, সাধারণ মানুষ বা বাজারে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন যে, পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব আরও দ্রুত ছড়ায়। সেই অর্থে সরকারের বক্তব্য একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, শুধুমাত্র ইতিবাচক বক্তব্য কি যথেষ্ট? বাস্তব চিত্র বলছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ ইতিমধ্যেই ভারতীয় বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। রুপির মানও গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার কমছে। এই সমস্ত সূচক অর্থনীতির ওপর চাপের প্রতিফলন। অর্থাৎ, সমস্যাটি কেবল ‘বাহ্যিক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না— তার প্রভাব অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।
এখানেই সরকারের নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সোনা আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বাড়ানো, বা অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এড়ানোর আহ্বান— এসব পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সুরাহা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার মতো কাঠামোগত পদক্ষেপ আরও জরুরি।
একই সঙ্গে, সাধারণ মানুষের ওপর এই নীতির প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, তার প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে। সার মহার্ঘ হলে কৃষিক্ষেত্রে চাপ বাড়ে, যা খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা— ভারত পরপর তৃতীয় বছরের জন্য ব্যালান্স অব পেমেন্টস ঘাটতির মুখে পড়তে পারে—এটিও হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় নয়। জিডিপি বৃদ্ধির হার কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে। এমনকি সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই সমস্ত ইঙ্গিত স্পষ্ট করে যে পরিস্থিতি সহজ নয়।
তবে এর মধ্যেও ভারতের অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে— তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং কাঠামোগত শক্তি।
বৃহৎ জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার— এই সবই ভারতের পক্ষে কাজ করছে। তাই পুরো চিত্রটিকে একপেশে ভাবে দেখা উচিত নয়।সর্বোপরি বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের বার্তা ও সতর্কতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই বাস্তব সমস্যার সৎ স্বীকৃতি এবং কার্যকর সমাধানও জরুরি। তিনটি ‘এফ’-এর সংকট মোকাবিলায় শুধু আহ্বান নয়, সুসংহত অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন। একই সঙ্গে, বিরোধী মতকে নেতিবাচক বলে উড়িয়ে না দিয়ে, যুক্তিযুক্ত সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়াও একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ। আস্থা ও বাস্তবতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভারতের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisement

Advertisement