• facebook
  • twitter
Sunday, 17 May, 2026

হরমুজ প্রণালীতে পাতা ইন্টারনেট তার নিয়ে ইরানের নতুন রণকৌশল

বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

আমেরিকা এবং ইজরায়েলের হামলার পরে হরমুজ প্রণালী কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে ইরান। তেলবাহী জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহের পরে এ বার তেহরানের নজর সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেটবাহী তারের দিকে। ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী এই সাবমেরিন কেবলগুলির জন্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলির থেকে ভাড়া বা শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা শুরু করেছে ইরান। আর সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট উদ্বেগ বেড়েছে।

ইরানের সরকার ঘনিষ্ঠ একটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীর গভীরে পাতা তারগুলির ব্যবহার চালিয়ে যেতে হলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে নতুন নিয়ম মানতে হতে পারে। ইরানের প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি যদি এই শর্ত না মানে, তা হলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

Advertisement

প্রসঙ্গত, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হল হরমুজ প্রণালী। পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাওয়া পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ দিয়েই চলাচল করে। পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশে পাতা একাধিক ইন্টারনেটবাহী তার আমেরিকা, ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান বজায় রাখে। ব্যাঙ্কিং পরিষেবা থেকে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন, সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা, দূরবর্তী কাজকর্ম, অনলাইন বিনোদন এবং সম্প্রচার— সব কিছুর সঙ্গেই জড়িত এই তারগুলি।

Advertisement

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই তারগুলির কোনও ক্ষতি হলে গোটা পৃথিবীর ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেতে পারে। ব্যাহত হতে পারে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনও। এমনকি বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যোগাযোগেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত সপ্তাহে ইরানের আইনপ্রণেতাদের একটি বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবর। সেখানেই নাকি সিদ্ধান্ত হয়, হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্রের তলদেশে পাতা তারগুলির জন্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছ থেকে শুল্ক আদায় করা হবে। ইরানি সেনার মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইন্টারনেটের তারেও ভাড়া চাপাব আমরা।’

ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডের সঙ্গে যুক্ত একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যামাজনের মতো সংস্থাগুলিকে ইরানের নিয়ম মেনে চলতে হবে। শুধু শুল্ক প্রদানই নয়, ওই তারগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতির দায়িত্বও ইরানের সংস্থাগুলির হাতে তুলে দেওয়ার দাবি উঠেছে।

তবে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ, বহু ‘সাবমেরিন কেবল’ ইরানের জলসীমা এড়িয়ে ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে পাতা হয়েছে। ফলে সব ক’টি তারের উপর ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। যদিও টেলিকম গবেষক আলান মলদিন জানিয়েছেন, ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গাল্ফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর কিছু তার ইরানের জলসীমার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আমেরিকার প্রযুক্তি সংস্থাগুলি সরাসরি ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। ফলে গুগল, মেটা বা মাইক্রোসফটের মতো সংস্থাগুলি ইরানের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ইরান কড়া বার্তাই দিতে চাইছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা। ইরানের একটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, গভীর সমুদ্রের এই তারগুলির ক্ষতি হলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি শিল্পে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বের ইন্টারনেট পরিষেবাতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দিনা এসফান্দিয়ারির মতে, ইরান এখন বুঝতে পারছে যে হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্ব অর্থনীতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই তেহরান নিজেদের কৌশলগত শক্তিকে আরও বড় অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যদি লোহিত সাগরেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়, তা হলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পরিষেবা আরও বড় সঙ্কটে পড়তে পারে। ২০২৪ সালে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর একটি ঘটনার জেরে তিনটি সাবমেরিন তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখন ওই অঞ্চলের প্রায় ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হয়েছিল বলে জানিয়েছিল হংকংয়ের এইচজিসি গ্লোবাল কমিউনিকেশনস।

ইতিহাস বলছে, সমুদ্রের তলদেশে পাতা যোগাযোগ ব্যবস্থা যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসাবেও বহু বার ব্যবহার হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল ব্রিটেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানও কি সেই পথে এগোচ্ছে কিনা তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।

Advertisement