এক সময় দেশের উৎপাদনশীলতার নিরিখে প্রথম সারিতে থাকা পশ্চিমবঙ্গ কি ফের শিল্পোন্নয়নের পথে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? রাজ্যের সেই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়েই এবার দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা শুরু করল কেন্দ্রের মোদী সরকার। বিজেপি প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর শিল্প, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন বৃদ্ধিকে সামনে রেখে রাজ্যের জন্য বিশেষ রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নীতি আয়োগকে। আর সেই কাজের নেতৃত্বে রয়েছেন সদ্য নিযুক্ত নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান, বাঙালি অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ি।
সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসাবে গড়ে তুলতেই জোর দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা, নদীবন্দরভিত্তিক বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। নীতি আয়োগের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় কলকাতাকে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
Advertisement
প্রসঙ্গত, চলতি মাসেই নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ি। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সদস্য হিসাবেও কাজ করেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বালুরঘাট থেকে বিজেপির টিকিটে জয়ী হলেও এ বার তাঁকে সরাসরি প্রশাসনিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নিয়ে এসেছে কেন্দ্র।
Advertisement
নীতি আয়োগের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থান এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভূটানের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থানকে বড় সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের আধুনিকীকরণ, পণ্যবাহী করিডর সম্প্রসারণ এবং নদীপথে বাণিজ্যের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজ্যের উৎপাদন শিল্পেও নতুন করে জোর দিতে চাইছে কেন্দ্র। সেজন্য বাংলার ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন, বস্ত্র এবং বৈদ্যুতিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পূর্ব ভারতের খনিজ বলয়ের সঙ্গে যুক্ত করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়। ফলে এই খাতকে কেন্দ্র করেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির আশা করছে নীতি আয়োগ।
শুধু বৃহৎ শিল্প নয়, কৃষিভিত্তিক শিল্পকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চা, দুগ্ধজাত পণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যের মাধ্যমে রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব। এর ফলে চাষিদের আয় বাড়ার পাশাপাশি কাজের খোঁজে ভিন্রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।
শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে দক্ষতা বৃদ্ধির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই অন্যতম লক্ষ্য। দক্ষিণ এবং পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের ফের রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনার সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সংবেদনশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল পুর ও পঞ্চায়েত পরিকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের শিল্পহীন পরিবেশ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিল্পমহলের একাংশের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নকে সামনে রেখেই এগোতে চাইছে বিজেপি। এখন দেখার, বিজেপির নেতৃত্বাধীন মোদী সরকারের পরিকল্পনার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবে কতটা সফল হয়।
Advertisement



