দায়িত্ব নিয়েই কড়া হাতে রাজ্য প্রশাসনের রাশ ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি একাধিক বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে রাজ্যের এবং জেলার শীর্ষ স্তরের আমলাদের কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। নবান্নে নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকেই প্রশাসনে বড় পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সোমবারের বৈঠকে সুশাসন, সীমান্ত সুরক্ষা, কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সামাজিক প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তোষামোদ রুখতে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, সরকারি কাজে বা কথায় কথায় আর ‘মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা’ শব্দটি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। বরং ‘অনুপ্রেরণা’ বন্ধ করে কাজের কাজ করা হোক। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, গত পনেরো বছরে আপনাদের মধ্যে অনেকেই অনেক ভুল করেছেন। এটা ঠিক, কিছু ক্ষেত্রে করণীয় কিছু ছিল না। যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনিই এই সব কিছু করিয়েছেন। কিন্তু আপনাদেরও কখনও কখনও অন্যায় দেখলে ‘না’ বলা উচিত ছিল। প্রথম দিনই স্পষ্ট করে বলছি, কিছু বলার থাকলে আমাকে সরাসরি বলবেন। কোনও পরামর্শ থাকলে নির্ভয়ে দেবেন। আমি শুনব। কারও কোনও সমস্যা হলে আমাকে বলবেন। ইতস্তত করবেন না।
Advertisement
রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বৈঠকে বসেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা, স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ, রাজ্যের ডিজিপি সিদ্ধনাথ গুপ্ত এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দর সঙ্গে একটি পর্যালোচনা বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, সুশাসন ও সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানানো হয়। রাজ্যের জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি সুনিশ্চিত করাই প্রাথমিকভাবে সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানানো হয়েছে।
Advertisement
প্রশাসনিক মহলের মতে, নতুন সরকার শুরু থেকেই সরকারি ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধ করার উপর জোর দিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ‘এই সরকার কোনও দলের সরকার নয়, মানুষের সরকার। সরকার চলবে সুশাসন, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের নীতিতে।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকার আমিত্বে চলে না, নীতিতে চলে।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ বার্তার উল্লেখ করে তিনি জানান, নতুন সরকার মানুষের নিরাপত্তা, আস্থা এবং উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন বোর্ড, নিগম এবং সরকারি সংস্থায় দায়িত্বে থাকা মনোনীত সদস্য ও চেয়ারম্যানদের পদ নিয়েও বড় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে সরকার। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ওই পদ থেকে তাঁদের সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তর থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বোর্ড, সংগঠন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং অ-আইনসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানে মনোনীত সদস্য, চেয়ারম্যান ও অধিকর্তাদের দায়িত্ব খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি অবসরের বয়স পেরিয়ে যাঁরা পুনর্নিয়োগ বা বর্ধিত মেয়াদে কাজ করছেন, তাঁদেরকেও নির্দিষ্ট পদ থেকে সরানোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এখন ডাবল ইঞ্জিন সরকারের ‘সুশাসন, সুরক্ষা’-র নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের উন্নয়নের ধারা অনুসরণ করেই বাংলা এগোবে বলেও দাবি করেন তিনি। এদিনের এই বৈঠকে সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচন প্রসঙ্গও উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, দীর্ঘদিন পরে পশ্চিমবঙ্গে ‘ভয়মুক্ত, রক্তপাতহীন এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন’ হয়েছে। ভোটার, প্রশাসন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে বিজেপির ৩২১ জন শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবে সরকার। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী সীমান্ত সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের কাজ দ্রুত শেষ করতে বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলার নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও বিএসএফ-কে এই জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের কাজ সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্যসচিবকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে জমি হস্তান্তর না হওয়ায় সীমান্ত সুরক্ষার কাজ আটকে ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে ১৭ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতার বসাতে প্রায় ৬৭ একর জমির প্রয়োজন। এছাড়া নতুন ৯টি বর্ডার আউটপোস্ট তৈরির জন্য আরও ১৮ একর জমি দরকার। সব মিলিয়ে প্রায় ১০৫ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, দক্ষিণবঙ্গের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২২১৭ কিলোমিটার। তার মধ্যে এখনও ৫৬৯ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতার বসানো হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১১৩ কিলোমিটার নদী সীমান্ত হওয়ায় সেখানে কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বাকি ৪৫৬ কিলোমিটার এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে।
রাজ্য সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার নবান্নে নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, আগামী সোমবারের মন্ত্রীসভা বৈঠকে ডিএ, বেতন কমিশন এবং এরিয়ার-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আরও একটি মন্ত্রীসভার বৈঠক হবে আগামী সোমবার। সেখানে আরজি কর ঘটনা, নারী নির্যাতন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বেতন কমিশন, এরিয়ার এবং ডিএ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা হবে। সোমবারের বৈঠকে কেন ডিএ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি, তার ব্যাখ্যাও দেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, সরকার গঠনের পর এটাই প্রথম কর্মদিবস ছিল। হাতে খুব বেশি সময় ছিল না। আগে থেকে প্রস্তুত থাকা কিছু বিষয় নিয়েই এ দিনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা করেছে নতুন সরকার। অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এজন্য স্বাস্থ্য দপ্তরকে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সঙ্গে দ্রুত সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, কৃষক বিমা যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনা, পিএম শ্রী, বিশ্বকর্মা এবং বেটি বাঁচাও বেটি পড়াওয়ের মতো একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জেলাশাসকদের দ্রুত আবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সেই সঙ্গে যুব সমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকারি চাকরির আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে মন্ত্রীসভা। দীর্ঘদিন ধরে চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ এই দাবি জানিয়ে আসছিল। কারণ ২০১৫ সালের পর রাজ্যে নিয়োগ প্রায় হয়নি। ফলে বেকারদের বয়স বেড়ে গিয়েছে। তাঁদের কথা মাথায় রেখেই চাকরির ক্ষেত্রে আবেদনের বয়সসীমা আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার আধিকারিকদের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজও শুরু হবে।
পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, জনগণনা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় নির্দেশ দীর্ঘদিন কার্যকর করা হয়নি। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক কারণে একাধিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আটকে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করেছে।
সামাজিক প্রকল্প নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমানে চালু থাকা কোনও সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না। তবে পুরো ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করা হবে। মৃত ব্যক্তি, অ-ভারতীয় বা ভুয়ো উপভোক্তারা যাতে সুবিধা না পান, তা নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এদিন নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য সচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা, স্বরাষ্ট্র সচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ, অর্থসচিব প্রভাত কুমার মিশ্র-সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনীয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডুও।
Advertisement



