একসময় পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে জনরোষ মানেই ছিল ভাঙচুর, আগুন এবং গণআক্রোশের বিস্ফোরণ। বিশেষ করে জঙ্গলমহলের উত্তাল সময়ে মাওবাদী ‘জন আদালত’-এর নামে চলত শাস্তি ঘোষণা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন রাজনৈতিক নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেই তদন্তের দায়িত্ব নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এমনই দু’টি ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই একাধিক তৃণমূল নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি প্রশাসনের।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেরই মনে পড়ছে, ২০০৯ সালের জঙ্গলমহলের উত্তপ্ত সময়ের কথা। পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ের ধরমপুর এলাকায় সিপিআই(এম)-এর এক নেতার পরিবারের বাড়ি ভেঙে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল উত্তেজিত জনতা। সেই সময় এলাকায় মাওবাদীদের প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, পুলিশও কার্যত ঢুকতে সাহস পেত না। গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্যের মধ্যে ওই পাকা দোতলা বাড়িটিকে ‘বিলাসিতার প্রতীক’ বলে তুলে ধরা হয়েছিল।
Advertisement
তৎকালীন পরিস্থিতিতে মাওবাদী শিবির দাবি করেছিল, ‘জনগণের নেতা হয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করা যাবে না।’ সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তথাকথিত ‘জন আদালত’-এর নির্দেশে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখন আর সশস্ত্র গোষ্ঠীর নির্দেশে নয়, বরং প্রশাসনিক তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি হাওড়ায় তৃণমূল নেতা শামিম আহমেদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক বিলাসবহুল ঘরের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। অভিযোগ, পোস্ট ভোট হিংসার তদন্তে গিয়ে বাড়ির ভিতরে গোপন দরজার আড়ালে বিশেষ কক্ষ এবং ভূগর্ভস্থ পথেরও হদিশ মেলে। দামি আসবাব, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর এবং অন্যান্য বিলাসবহুল সামগ্রী দেখে তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, সেটি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীর বাড়ির চেয়ে ‘অভিজাত অতিথিশালা’র মতোই ছিল।
শামিম আহমেদ প্রাক্তন কাউন্সিলর সামিমা বানোর স্বামী এবং তৃণমূলের ওয়ার্ড স্তরের নেতা বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের পৈলানে তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলের তথাকথিত ‘ফার্মহাউস’-এ তল্লাশি চালিয়েও বিপুল বিলাসিতার ছবি সামনে এসেছে বলে দাবি পুলিশের। বিশাল সুইমিং পুল, বড় বাগান, কৃত্রিম বন্যপ্রাণীর মূর্তি-সহ নানা বিলাসবহুল পরিকাঠামো সেখানে দেখা গিয়েছে বলে সূত্রের খবর।
একটি ভিডিওতে বিধায়ককে হুমকি দিতে দেখা গিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠার পরেই এই তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। ২০১১ সাল থেকে টানা চারবার বিষ্ণুপুর কেন্দ্রের বিধায়ক রয়েছেন দিলীপ মণ্ডল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ভোট পরবর্তী হিংসার ইতিহাস থাকলেও এবার প্রশাসন আইনি পদ্ধতিতে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পত্তির অভিযোগ খতিয়ে দেখানোর বার্তা দিতে চাইছে।
যদিও বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, এই অভিযানগুলির নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও বড় জনরোষ বা প্রতিশোধমূলক ঘটনার খবর সামনে আসেনি।
Advertisement



