• facebook
  • twitter
Tuesday, 12 May, 2026

অঙ্ক-বিজ্ঞানের চাপ কমাতে বড় বদল সিবিএসই পাঠ্যক্রমে

নবম শ্রেণি থেকেই দু’টি স্তরে পড়াশোনার সুযোগ

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার কাছে অঙ্ক এবং বিজ্ঞান বরাবরই আতঙ্কের বিষয়। বিশেষ করে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই কঠিন সূত্র, জটিল অঙ্ক, তত্ত্বভিত্তিক বিজ্ঞান এবং পরীক্ষার চাপ বহু ছাত্রছাত্রীর মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটল কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সিবিএসই পাঠ্যক্রমে অঙ্ক ও বিজ্ঞানের জন্য চালু হচ্ছে দু’টি পৃথক স্তর— ‘স্ট্যান্ডার্ড’ এবং ‘অ্যাডভান্সড’। শিক্ষামহলের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ বহু পড়ুয়ার মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় নবম শ্রেণি থেকে সব ছাত্রছাত্রীকে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ অঙ্ক এবং বিজ্ঞান পড়তেই হবে। এই অংশে সাধারণ ও বাধ্যতামূলক পাঠ্যসূচি থাকবে। অন্যদিকে, যেসব পড়ুয়া ভবিষ্যতে প্রকৌশল, গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা উচ্চতর বিজ্ঞানচর্চার দিকে এগোতে চায়, তারা চাইলে অতিরিক্ত ‘অ্যাডভান্সড’ পাঠ্যক্রম বেছে নিতে পারবে। অর্থাৎ, একই শ্রেণিতে পড়লেও সব ছাত্রছাত্রীর উপর সমান মাত্রার জটিল পাঠের চাপ আর থাকবে না।

Advertisement

শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিল যে অঙ্ক ও বিজ্ঞানভীতি বহু পড়ুয়ার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার নম্বর কমে যাওয়া, কোচিংয়ের অতিরিক্ত চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনা থেকে তৈরি হচ্ছিল উদ্বেগ। নবম ও দশম শ্রেণিতে এসে বহু পড়ুয়া এই দুই বিষয়কে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করত। ফলে পড়াশোনার প্রতি অনীহা, মানসিক অবসাদ এবং পরীক্ষাভীতি বাড়ছিল।

Advertisement

এই পরিস্থিতিতে সিবিএসইয়ের নতুন পরিকল্পনাকে অনেকেই ‘পাঠ্যক্রমে নমনীয়তার সূচনা’ বলে মনে করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সব ছাত্রছাত্রীর দক্ষতা বা আগ্রহ একরকম নয়। কেউ ভাষা বা সমাজবিজ্ঞানে ভালো, কেউ আবার বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিতে আগ্রহী। অথচ এতদিন একই ধরনের কঠিন পাঠ্যক্রম সবার উপর চাপিয়ে দেওয়া হত। নতুন ব্যবস্থায় পড়ুয়ারা নিজেদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অনুযায়ী বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

মনোবিদদের একাংশও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, কম বয়স থেকেই যদি পড়ুয়ার উপর অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপ কমানো যায়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ছাত্রছাত্রী অঙ্কভীতি বা বিজ্ঞানভীতিতে ভোগে, তারা স্ট্যান্ডার্ড স্তরে স্বচ্ছন্দে পড়াশোনা করতে পারবে। এতে পরীক্ষার ফলও তুলনামূলক ভালো হতে পারে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। অনেক শিক্ষকের মতে, স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং আলাদা পাঠদানের ব্যবস্থা না থাকলে বাস্তবে এই পরিকল্পনা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। গ্রামাঞ্চল বা ছোট শহরের বহু স্কুলে শিক্ষকসংকট রয়েছে। সেখানে একই সঙ্গে দু’টি স্তরের পাঠদান কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

শিক্ষামহলের আরেকটি অংশের আশঙ্কা, ‘অ্যাডভান্সড’ স্তরকে ঘিরে ফের নতুন ধরনের সামাজিক বিভাজন তৈরি হতে পারে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের উপর চাপ সৃষ্টি করে উন্নত স্তর বেছে নিতে বাধ্য করতে পারেন। ফলে যে মানসিক চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ, সেটাই উল্টে নতুন প্রতিযোগিতার রূপ নিতে পারে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।

তবু সামগ্রিকভাবে সিবিএসইয়ের এই সিদ্ধান্তকে দেশের স্কুলশিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্য অনুযায়ী, পড়াশোনাকে আরও নমনীয়, দক্ষতাভিত্তিক এবং পড়ুয়াবান্ধব করে তোলার দিকেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা সফল হয়, তার উপরই নির্ভর করবে দেশের বহু পড়ুয়ার শিক্ষাজীবনের চাপ কতটা কমবে।

Advertisement