শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। প্রথা অনুযায়ী, বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর শনিবার রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন তিনি। এই নিয়ে মেদিনীপুর থেকে দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন শুভেন্দু। এর আগে এই জেলা থেকে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। তিনি ১৯৬৭, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। ফলে রত্নগর্ভা বিদ্যাসাগরের জেলা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন করে আরও এক মাইল ফলক স্থাপন করতে চলেছে।
শনিবার সকাল ১১টায় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, এনডিএ শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে সূত্রের খবর। নতুন সরকারের প্রথম কাজ কী হতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। প্রশাসনিক পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিল্প বিনিয়োগের মতো একাধিক ইস্যুতে দ্রুত পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে বিজেপি সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
Advertisement
প্রসঙ্গত, নতুন সরকার গঠনের পৌরোহিত্যের কাজে প্রধান ভূমিকা নিতে পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী শুক্রবার সকাল সকাল কলকাতায় আসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শহরে এসেই প্রথমে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরে পুজো দিয়ে রওনা হয়ে যান নিউটাউনের বিশ্ববাংলা কনভেশন সেন্টারে। সেখানে বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়ক এবং শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে বৈঠক শুরু হয়। সূত্রের খবর, বৈঠকে দলের বিজয়ী বিধায়কদের নেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম প্রস্তাব করা হলে উপস্থিত বিধায়করা সর্বসম্মতভাবে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানান। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে পরিষদীয় দলের নেতা ঘোষণা করা হয়। বিধায়কদলের বৈঠকের পর শাহ বলেন, ‘পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আটটি প্রস্তাব এসেছিল। সব প্রস্তাবে একটিই নাম ছিল। দ্বিতীয় নামের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনও দ্বিতীয় নাম আসেনি। তাই শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করছি।’
Advertisement
এরপর শুভেন্দু নিজের প্রথম বক্তব্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানান জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দকে। তিনি বক্তব্যের শুরুতে উচ্চারণ করেন, ‘চরৈবেতি’ অর্থাৎ এগিয়ে চলো। তিনি বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের এই মন্ত্র নিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চান।
দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে শুভেন্দু বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদীকে ধন্যবাদ। ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ভারত সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দকে প্রণাম জানাই। বাংলার মানুষ আমাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে স্মরণ করতে চাই ৩২১ জন বিজেপি কর্মীকে, যাঁরা আত্মবলিদান দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘যে নরেন্দ্র মোদী বাংলার মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তাঁকে কোটি কোটি প্রণাম।’
এরপর অমিত শাহের প্রতিশ্রুতির কথাও স্মরণ করেছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘চার্জশিট প্রকাশের দিন শাহ দু’টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাংলার মানুষকে। সন্দেশখালি থেকে আরজি কর হয়ে যত জায়গায় মা-বোন-কন্যাদের অত্যাচার করা হয়েছে, তা নিয়ে কমিশন বসবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে।’ প্রসঙ্গত, প্রচারে এসে মোদী, শাহ বার বার মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মানুষজন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুবিধা পাবেন। আর চার্জশিট প্রকাশের দিন শাহ বলেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি যারা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে কমিশন বসানো হবে। সরকারি অর্থ যারা নয়ছয় করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। কথা দিতে পারি, মন্ত্রীমণ্ডল, আগামী বিধায়ক দল, বিজেপি সরকার, বিচারধারার সঙ্গে যুক্ত লোকজন, পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক চেতনা সম্পন্ন নাগরিকদের নিয়ে সঙ্কল্প পূরণ করব।
শুভেন্দু দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার বিজেপি কর্মী অত্যাচার, হিংসা এবং মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশে শুভেন্দুর আশ্বাস, বিজেপি সরকার তাঁদের স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করবে। তাঁর কথায়, ‘যে হাজার হাজার ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী ঘরছাড়া রয়েছেন, মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত রয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন, নিজের পরিজনকে হারিয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব আমার।’
নতুন সরকারের কাজের ধরন নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘কথা কম, কাজ বেশি’ নীতিতেই চলবে সরকার। বিশেষ করে মা-বোনেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সন্দেশখালি এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনার প্রসঙ্গও নিজের বক্তব্যে তোলেন শুভেন্দু। তিনি জানান, এই ঘটনাগুলির তদন্তে পৃথক কমিশন গঠন করা হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠনের কথাও ঘোষণা করেন।
নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে গ্যারান্টিগুলি দিয়েছিলেন, সেগুলি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার একসঙ্গে কাজ করে বাংলার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে। একই সঙ্গে আগামী দিনে বিজেপির জনসমর্থন ৪৬ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যও সামনে আনেন তিনি।
প্রসঙ্গত, শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রাপথও যথেষ্ট ঘটনাবহুল। ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলিতে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শুভেন্দু প্রথমবার ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভা থেকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল গঠন করলে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরে কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যানও হন তিনি।
২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জমি অধিগ্রহণ বিরোধী সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। এই সময়ে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেই আন্দোলনের পরই বাংলার রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে শুরু করে। পরে তিনি জঙ্গলমহলেও সংগঠন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। বাংলার মানুষ মনে প্রাণে তাঁকে একজন প্রকৃত জননেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এরপর ২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন শুভেন্দু। পরে ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় পরিবহণ মন্ত্রী হন। দীর্ঘদিন তৃণমূলের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত থাকলেও ২০২০ সালে দল ছাড়েন শুভেন্দু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। রাজনৈতিক সূত্রের মতে, তৃণমূলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব বৃদ্ধি এবং সংগঠনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে নির্বাচনী কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আই-প্যাকের বাড়তি ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। সেই সময় থেকেই দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রতীকী মুহূর্ত হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুভেন্দুর পরপর দু’বার পরাজিত করা। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন শুভেন্দু। আর ২০২৬ সালে ভবানীপুরেও তৃণমূল নেত্রীকে পরাজিত করে কার্যত বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি।
শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত জীবনও রাজনৈতিক মহলে বরাবর আলোচনার বিষয়। তিনি অবিবাহিত। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনদর্শন থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী। ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী এবং সৌমেন্দু অধিকারীও সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক জীবনে চারজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে হারিয়েছেন শুভেন্দু। সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের হত্যাও তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। সেই আবেগের কথাও সম্প্রতি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর বাংলায় বিজেপির এই উত্থানের অন্যতম প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি ঐতিহাসিক ফল করেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারের বাইরে শুক্রবার থেকেই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। দলীয় পতাকা, আবির এবং ঢাকের শব্দে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। বহু কর্মী শুভেন্দুর নাম ধরে স্লোগান দিতে থাকেন। রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকার গঠন ঘিরে কর্মীদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পথে এগোল। কারণ এই পরিবর্তন শুধু সরকার বদল নয়, আগামী দিনে বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।
Advertisement



