• facebook
  • twitter
Monday, 27 April, 2026

রঘু রাই (১৯৪২–২০২৬): লেন্সের ভেতর দিয়ে ইতিহাসকে দেখার এক অনন্য দৃষ্টি

প্রথমে প্রোস্টেট, পরে পাকস্থলী এবং শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়া এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে তিনি ক্রমশ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।

ফাইল চিত্র

সৈয়দ হাসমত জালাল

ভারতীয় আলোকচিত্রের জগতে এক যুগের অবসান ঘটল প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাইয়ের প্রয়াণে। রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬— এই দিনটি শুধু একজন মানুষের মৃত্যুদিন নয়, বরং ভারতীয় ভিজ্যুয়াল ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অন্তিম মুহূর্ত।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি দীর্ঘ কর্মজীবনে রঘু রাই কেবল ছবি তোলেননি; তিনি সময়কে, সমাজকে, ইতিহাসকে এবং মানুষের অন্তর্লোককে এক অসামান্য সংবেদনশীলতার সঙ্গে ধারণ করেছেন।

Advertisement

১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের ঝাং-এ জন্মগ্রহণ করেন রঘু রাই। দেশভাগের অভিঘাত তাঁর শৈশবকে ছুঁয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর ছবির অন্তর্গত মানবিক বোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পেশাগতভাবে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিলেন। কিন্তু জীবনের বাঁক আসে ২৩ বছর বয়সে, যখন তাঁর দাদা তাঁকে ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই পরিচয়ই হয়ে ওঠে তাঁর আত্ম-আবিষ্কারের পথ।

Advertisement

১৯৬৬ সালে দ্য স্টেটসম্যান সংবাদপত্রের দিল্লি অফিসে প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি পেশাদার জীবনে প্রবেশ করেন। এই সময়েই তাঁর চোখ তৈরি হতে থাকে— সেই চোখ, যা শুধুমাত্র দৃশ্য দেখে না, বরং দৃশ্যের অন্তর্গত সত্যকে আবিষ্কার করে।

রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর মানবিক সংবেদনশীলতা। তিনি ঘটনাকে কেবল ‘কভার’ করেননি, তিনি ঘটনাকে ‘বোঝার’ চেষ্টা করেছেন। তাঁর ছবিতে প্রায়শই দেখা যায় আলো ও ছায়ার এক কাব্যিক বিন্যাস, যা বিষয়বস্তুকে আরও গভীর অর্থ দিয়েছে।

তিনি ভারতের শহর, গ্রাম, জনজীবন, দারিদ্র্য, আধ্যাত্মিকতা— সবকিছুকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা একদিকে বাস্তব, অন্যদিকে প্রায় প্রতীকী। তাঁর ক্যামেরা কখনও মমতাহীন নয়। বরং তা এক সহমর্মী দর্শকের মতো, যে দেখে, অনুভব করে এবং সেই অনুভবকে ফ্রেমবন্দি করে।

রঘু রাইয়ের কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল তাঁর ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলিকে ধারণ করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর তাঁর কভারেজ তাঁকে ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী সম্মান এনে দেয়। যুদ্ধের বিভীষিকা, শরণার্থীদের দুর্দশা এবং মানবিক সংকট— এই সবকিছুকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন, যা শুধু সংবাদ নয়, এক গভীর মানবিক দলিল।

এছাড়াও তিনি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বহু স্মরণীয় প্রতিকৃতি তাঁর তোলা। তাঁর ছবিতে ইন্দিরা গান্ধী কখনও কঠোর, কখনও ক্লান্ত, কখনও একাকী— একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বহুমাত্রিক মানবিক রূপ সেখানে ধরা পড়েছে।

রঘু রাইয়ের ক্যামেরা শুধু রাজনীতি বা সংঘাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকেও গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তিব্বতের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব দলাই লামার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক তাঁর ছবিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। তাঁর তোলা দালাই লামার ছবি শুধু প্রতিকৃতি নয়, বরং এক অন্তর্মুখী শান্তির প্রতিফলন। একইভাবে মাদার টেরিজার জীবন ও কর্মও তাঁর ক্যামেরায় এক গভীর মানবিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। তিনি কেবল ব্যক্তির ছবি তোলেননি, তাঁদের জীবনের দর্শনকেও ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

রঘু রাইয়ের কাজ শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে। টাইম, লাইফ, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট এবং দ্য নিউ ইয়র্কার-এর মতো বিশ্বখ্যাত পত্রিকায় তাঁর কাজ প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী হেনরি কার্টিয়ের-ব্রেসনের সুপারিশে তিনি ম্যাগনাম ফটোজ-এর সদস্যপদ পান, যা একজন আলোকচিত্রীর জন্য বিরল সম্মান। এই স্বীকৃতি তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করে।

তিনি তিনবার ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতার বিচারক এবং দু’বার ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। এ ছিল তাঁর শিল্পদৃষ্টির প্রতি বিশ্বের আলোকচিত্র জগতের আস্থার প্রমাণ।

রঘু রাইয়ের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ। তাঁর ‘হিউম্যান ম্যানেজমেন্ট অফ ওয়াইল্ড লাইফ অফ ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ফটো-প্রবন্ধ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এ প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার এনে দেয়। এই কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের জটিলতাকে তুলে ধরেন।

রঘু রাই তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পদ্মশ্রী ছাড়াও ২০০৯ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে ‘অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ সম্মানে ভূষিত করে। আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এ তাঁর অবদানের স্বীকৃতি।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন শান্ত, সংযত এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণশীল একজন মানুষ। তাঁর পরিবার— স্ত্রী গুরমিত, পুত্র নিতিন এবং কন্যারা—তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। তাঁর পুত্র নিতিন রাই-ও একজন প্রতিষ্ঠিত আলোকচিত্রী, যিনি রঘু রাইয়ের উজ্জ্বল উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে চলেছেন।

জীবনের শেষ কয়েক বছরে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছেন। প্রথমে প্রোস্টেট, পরে পাকস্থলী এবং শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়া এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে তিনি ক্রমশ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তবুও তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতি নিষ্ঠা কখনও ক্ষীণ হয়নি।

রঘু রাইয়ের প্রয়াণে ভারতীয় আলোকচিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হল। কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর দৃষ্টি, তাঁর সংবেদনশীলতা— এসবই থেকে যাবে আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, একটি ছবি শুধু একটি মুহূর্তকে ধরে রাখে না; তা একটি সময়, একটি সমাজ, একটি অনুভবকে ধারণ করে। তাঁর ছবিগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেখা মানেই শুধু দেখা নয়, দেখা মানে অনুভব করা, উপলব্ধি করা।

রঘু রাই নেই, কিন্তু তাঁর আলো রয়ে গেল— সময়ের ভেতর, ইতিহাসের ভেতর, আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির ভেতর।

Advertisement