স্বাধীনতার পর থেকে ভোটদানে নজির গড়ল পশ্চিমবঙ্গ। বঙ্গভোটের প্রথম দফাতেই তৈরি হল ঐতিহাসিক রেকর্ড। ১৫২টি কেন্দ্রে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভোটদানের গড় হার ৯২.০৭ শতাংশে, যা স্বাধীনতার পর এই রাজ্যে সর্বোচ্চ বলে মনে করা হচ্ছে। দিনভর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বিপুল সংখ্যক ভোটার তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। সকাল থেকেই বুথে বুথে ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়, যা সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। প্রথম দফার ভোটের পরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে সর্বোচ্চ ভোটদান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর সকল ভোটারকে আমি কুর্নিশ জানাই।‘
বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে শমসেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে—৯৫.৩৪ শতাংশ। খুব কাছাকাছি রয়েছে ভগবানগোলা, যেখানে ভোট পড়েছে ৯৫.৩১ শতাংশ। নন্দীগ্রামে ভোটদানের হার ৯০.০৩ শতাংশ এবং বহরমপুরে ৮৯.৬০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ভোটদানের হার দক্ষিণ দিনাজপুরে— ৯৩.১২ শতাংশ। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে কালিম্পঙে— ৮১.৯৮ শতাংশ। এদিন ভেঙে গিয়েছে ২০১১ সালের পরিবর্তনের ভোটের রেকর্ডও।
Advertisement
বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় রাজ্যের ১৬টি জেলার মোট ১৫২টি আসনে ভোট হয়। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার মতো জেলাগুলিও এই পর্বে ভোট হয়। এই নির্বাচন ঘিরে মূল লড়াই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে। টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় ফিরতে মরিয়া তৃণমূল, অন্যদিকে প্রথমবার বাংলার মসনদ দখলের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়েছে বিজেপি। পাশাপাশি কিছু আসনে সিপিএম এবং কংগ্রেসও লড়াই চালাচ্ছে।
Advertisement
প্রথম দফার ভোটে একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হতে চলেছে। সব থেকে বেশি নজরে রয়েছে নন্দীগ্রাম। মুখোমুখি লড়ছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর। আসানসোলে অগ্নিমিত্রা পালের সঙ্গে তৃণমূলের তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। খড়গপুর সদরে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন দিলীপ ঘোষ।
উত্তরবঙ্গেও জমজমাট লড়াই দেখা গিয়েছে। কোচবিহারের মাথাভাঙায় নিশীথ প্রামাণিক এবং দিনহাটায় উদয়ন গুহর মতো নেতারা লড়াই করছেন। একইসঙ্গে তৃণমূলের একাধিক মন্ত্রী ও জেলা সভাপতিদের জন্যও এই দফা একপ্রকার অগ্নিপরীক্ষা।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ভোটদানের হারকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গিয়েছে এবারের এই পর্ব। ২০২১ সালে এই ১৫২টি আসনে ভোট পড়েছিল ৮৩.২ শতাংশ আর ২০২৪ সালে তা ছিল ৭৯.৮ শতাংশ।
এখন নজর দ্বিতীয় দফার ভোটের দিকে। যদি একই ধারা বজায় থাকে, তবে সর্বভারতীয় স্তরেও নতুন নজির গড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গ। এখনও পর্যন্ত দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটদানের রেকর্ড ছিল পুদুচেরির দখলে, যেখানে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৯.৯৩ শতাংশ। তার আগে আসামে ৮৫.৩৮ শতাংশ ভোট পড়ে রেকর্ড তৈরি হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট ইতিমধ্যেই সেই রেকর্ড স্পর্শ করেছে। তবে চূড়ান্ত গড় ভোটদানের হার কত দাঁড়াবে এবং তা সর্বভারতীয় স্তরে নজির গড়বে কি না, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী দফার ভোট শেষ হওয়ার পরেই। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার ছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে—৮৪.৩৩ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে গিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদিন মোট ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ৭৭ হাজার ১৭১ জন ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। এর মধ্যে ১ কোটি ৮৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ৪৯৬ জন পুরুষ, ১ কোটি ৭৫ লক্ষ ৭৭ হাজার ২১০ জন মহিলা এবং ৪৬৫ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এই দফায় মোট ১৪৭৮ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে।
Advertisement



