আশিসকুমার পাল
দেশের সাধারণ মানুষের জ্ঞাতার্থে এই কথাগুলো লেখার প্রয়োজন বোধ হয় যে, সরকারি কর্মচারীদের সামগ্রিক বেতন (Gross salary) অনেকগুলি অংশের যোগফল। সাধারণভাবে, এই অংশগুলি হল— মূল বেতন (Basic Pay), মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance), বাড়ি ভাড়া ভাতা (House Rent Allowance), চিকিৎসা ভাতা (Medical Allowance) এবং এ ছাড়াও কাজের অবস্থা ও অবস্থানের নিরিখে অন্যান্য আর্থিক ও দ্রব্যগত সুযোগ সুবিধা। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা নিয়মিতভাবে মহার্ঘ ভাতা পেয়ে থাকেন। কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণত বছরে দুইবার এই ভাতা ঘোষণা করে থাকে। পাশাপাপাশি রাজ্য সরকারগুলি তাদের আর্থিক টানাটানির কারণে সবক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা দিতে সক্ষম হয় না। ফলে, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য একটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বভাবত রাজ্য সরকারগুলি অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আর্থিক অবস্থার নিরিখে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতার দায় কেন্দ্রীয় সরকারের ঘাড়ে চাপানোর বিষয়ে সরব হয় এবং বাধ্য হয়। বাজারে জিনিস পত্রের দাম ক্রমবর্ধমান হতে থাকলে স্থির আয়ে জীবনযাত্রার মানের অবনমন ঘটে। এজন্য দেশের বাজারে মূদ্রাস্ফীতির হারের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের নির্দিষ্ট হারে মহার্ঘ ভাতা প্রদান করার নিয়ম ভারতে স্বাধীনোত্তরকালের প্রচলিত রীতি। পরিসংখ্যান বিদ্যায় নিয়ম মেনে Consumer Price Index (CPI) বা উপভোক্তার মূল্য সূচক এবং Cost of Living Index (CLI) বা জীবন ধারণের ব্যয় সূচকের সাহায্যে কর্মচারীদের প্রাপ্য মহার্ঘ ভাতা নির্নয় করা হয়। বতর্মানে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতার বিষয়টি প্রাপকদের বঞ্চনা ভাবনার মাথাব্যথা ঠিকই, তার চাইতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি পালে বাতাস টানার প্রতিযোগিতায় আলোচনার জমজমাট আসর তৈরি করেছে। এ বিষয়ে উল্লেখ্য, বাজারে জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বগতি হলে তথা মুদ্রাস্ফীতি হতে থাকলে সরকারি কর্মচারীদের জীবন যাত্রার মান অপরিবর্তিত রাখতে নির্দিষ্ট হারে মহার্ঘ পাওয়া অধিকার, এ কথা সত্যি হলেও বেতন তথা আয় বৃদ্ধির অন্যান্য দিকগুলিও জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে বা জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের দ্যোতক।
Advertisement
এখন প্রশ্ন হল, এই মহার্ঘ ভাতা রাজ্যের সরকারি কাজে কর্মরত প্রায় ২% (বর্তমান কর্মচারী+অবসর প্রাপ্ত) মানুষের মূল্যস্ফীতি- জনিত ক্ষতিপূরণের মাধ্যম হলেও বাকি জনগণের অবস্থা কী? কেউ হিসেব রাখে? তাছাড়া, সরকারি কর্মচারীদের কত শতাংশই বা সত্যি সত্যি সমস্যায় রয়েছে? পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারি, সরকার পোষিত বা আধাসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরত ৩০০ জনের বিভিন্নভাবে সংগৃহীত পক্ষপাতহীন নমুনা (Random Sampling) থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য, বিভিন্ন সরকার প্রতিষ্টানের প্রধান পদাধিকারী, সরকারি কর্মক্ষেত্রের আশেপাশের সাধারণ মানুষ এবং ওই সমস্ত ক্ষেত্র পরিষেবা গ্রহণকারীদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে গবেষণালব্ধ ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো! প্রথমত, প্রাপ্য ডিএ না পেয়ে কম মাইনের কর্মচারী (বর্তমান + অবসরপ্রাপ্ত) সত্য সত্যই সমস্যায় আছেন এঁরা৷ মোট সরকারি কর্মচারীদের ১৫% এবং মোট জনগণের ০.৩% অর্থাৎ রাজ্যের প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে ৩জন মাত্র। দ্বিতীয়ত, কর্মচারীদের মাত্র ০% (প্রায়) নিজস্ব কাজের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্বশীল। তৃতীয়ত, প্রতিদিন আসা-যাওয়া ও ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে ৮৫% কর্মচারী যথাযথ নিয়ম মেনে চললেও ১৫% এ বিষয়ে সজ্ঞানে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এড়িয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নিয়মকানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপারগ। চতুর্থত, কর্মক্ষেত্রের নির্দিষ্ট কাজের দিন বা সময় অন্যভাবে ব্যবহার করে উপরি আয় করেন (দেরিতে কর্মস্থলে আসা বা আগে বেরিয়ে যাওয়া, ছুটিতে থেকে অন্য উপায়ে উপার্জনে ব্যস্ত থাকা) এমন কর্মচারী ২৫%, অর্থাৎ প্রতি ৪জনে একজন। পঞ্চমত, কর্মচারীরা কর্মস্থলের মধ্যে কাজের ফাঁকে বা অবসরে এমনকি কাজের সময় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বা অগ্রগতির কথা না ভেবে, নিজেদের ঘর সংসার, আয়-ব্যয়, হাট-বাজার, রাজনৈতিক কথা-বার্তা এবং পরনিন্দা-পরচর্চায় অনেক বেশি উৎসাহ দেখাতে অভ্যস্ত। ষষ্ঠত, কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ, অদৃশ্য ক্ষমতার অঙ্গুলি হেলনে কর্মস্থলে হাজির না থেকেও ৬.৫% সরকারি কর্মচারী খাতায়-কলমে হাজিরা প্রমাণ করে। সপ্তমত, বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরত কর্মচারীদের মতো সরকারি কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়ণ ও জবাবদিহির যথাযথ ব্যবস্থা এক প্রকার না থাকা এবং সেইসঙ্গে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা সরকারি কর্মচারিদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্ব জ্ঞানহীন করে তুলেছে একথা বলা অত্যুক্তি হবে না।
Advertisement
পরিশেষে সরকারি কর্মচারী হয়ে সরকারি পরিষেবার বিকল্প থাকা সত্বেও সরকারি পরিষেবাতে বিশ্বাসী এবং তা ভালোবাসে/পছন্দ করে এমন কর্মচারী মাত্র ৫%। এবার বুঝুন ঠ্যালা— তাহলে সরকারি ক্ষেত্রে সেবা দানকারীদের ৯৫% নিজেদের পরিষেবার উপর আস্থা বা বিশ্বাস রাখতে অপারগ।
যেখানে সরকারি ক্ষেত্রকে রুজি-রুটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা কর্মচারীদের সিংহভাগই সরকারি ক্ষেত্রের প্রধান অন্তরায়। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে বহুমুখী ভাবগম্ভীর কঠিন প্রশ্নটি হল, সরকারি ক্ষেত্র কার জন্য? কেন? এবং কীভাবেই-বা টিকে থাকবে? এ তো বিসমিল্লায় গলদ আর ভাবের ঘরে চুরি। বিভিন্ন রাজ্যে ও সারা দেশে সরকারি কর্মচারীদের অগণিত সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী ও রাজনৈতিক সংগঠন ও সংঘ রয়েছে যারা কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রতিনিয়ত সরব ও আন্দোলন করে৷ কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য ও করণীয় বিষয় নিয়ে সরব হয়েছে বা আত্মমূল্যায়ন ও আত্মসমালোচনা-সহ আত্মসংশোধনে কথা বলছে বা বলেছে, নতুবা কিছু করেছে বা করছে, এমন নজির আছে কিনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে বর্তমানে ভারতে সরকারি ক্ষেত্রগুলি বহু সমস্যায় জর্জরিত৷ তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি হল— কাজের দীর্ঘসূত্রিতা বা কাজে গড়িমসি করা, যোগ্য কর্মচারীদের যথাযোগ্য মর্যাদা না দিয়ে রাজনৈতিক রঙের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া; কাজের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং অনেক নিয়োগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবে অযোগ্য লোকেদের সুযোগ করে দেওয়া; নিয়োগ পদ্ধতির দীর্ঘসূত্রিতা; কাজের ধরন ও প্রয়োজন অনুসারে নির্দিষ্ট সংখ্যক যথাযোগ্য লোক না থাকা।
তবে একথা ঠিক যে, সামগ্রিক ও ঐকান্তিক প্রয়াস সরকারি ক্ষেত্রে মিরাকল সৃষ্টি করতে পারে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিককালে দিল্লিতে সরকারি শিক্ষা ক্ষেত্রের ঘুরে দাঁড়ানো ভারতের ইতিহাসে সরকারি ক্ষেত্রের পুনর্জাগরণের অনন্য নজির গড়ে তুলেছে। আসলে সরকারও এখন উপলব্ধি করছে— সরকারি কর্মচারীরা এখন মাথাব্যথায় পরিণত হয়েছে। যে ভাবেই হোক তাদের ঝেড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে৷
বিগত প্রায় তিন দশক ধরে সরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ অব্যাহত। এতে এক ঢিলে তিন পাখি মারছে সরকার, যথা— প্রথমত, বর্ধিত বেতনের বোঝা লাঘব করা; দ্বিতীয়ত, আপাত বেকারত্ব নিরসন করা এবং তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের পথ সুগম করা (বিষয়টি অপ্রিয় হলেও সত্য)। উল্লেখ্য, স্বাধীনোত্তরকালে গভীর দেশাত্মবোধ ও ভালোবাসা থেকে ১৯৫৬ সালের শিল্পনীতি-সহ সামগ্রিক উন্নয়নের ধারায় সরকারি ক্ষেত্রের যে নবজাগরণ ঘটেছিল, তার প্রভাবে পরিকল্পনার ৪ দশকে (১৯৫১-১৯৯১) তা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে ঘোষিত নয়া আর্থিক নীতির এলপি এবং ১৯৯৪ সালের সংযোজিত জি-সহ এলপিজি (L= Libaralization, P=Privatization & G=Globalization) মার্কা নয়া আর্থিক নীতির হাত ধরে মনুষ্যসৃষ্ট বা শ্রমনির্ভর পরিষেবার পরিবর্তে তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে এগোতে শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিয়োগের পথ ক্রমশ সংকীর্ণ করে চলেছে, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বেসরকারিকরণের ধাক্কায় জনমানসেও আত্মকেন্দ্রিক ভাবনার বীজ বাসা বেঁধেছে বোধহয়। বতর্মান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারি ক্ষেত্রকে বহুজাতিক ও ক্ষমতাশীল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অথবা প্রযুক্তিগত নকল মেধার সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সরকারের ওপর দোষ চাপানোর আগে সরকারি কর্মচারীদের আত্মমূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধন অনিবার্য। তাই মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আন্দোলন চলছে চলুক, তার সঙ্গে সরকারি ক্ষেত্রকে বাঁচাতে মহার্ঘ ভাবনাও জরুরী নয় কি?
Advertisement



