• facebook
  • twitter
Thursday, 16 April, 2026

বর্তমান ভারতে আম্বেদকরের অর্থনৈতিক ভাবনা এখনও প্রাসঙ্গিক

তাঁর গবেষণা পত্র ‘The Problem of Rupee’ উপস্থাপন করেন। তাঁর অর্থনৈতিক আদর্শের মূল ছিল দেশের অধিকাংশ মানুষের হিত এবং দারিদ্র্য মোচন।

ফাইল চিত্র

সুকান্ত পাল

ড. ভীমরাও আম্বেদকরের একশো চৌত্রিশতম জন্ম বার্ষিকীতে একটি কথাই মনে হচ্ছে যে, ভারতের সংবিধান রচনার মূল ব্যক্তিত্ব এবং অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে এক আপোষহীন যোদ্ধা— এই রূপেই তিনি আমাদের কাছে পরিচিত। কিন্তু এই মহান ব্যক্তির অর্থনৈতিক ভাবনা নিয়ে পণ্ডিতমহলে কিছু আলোচনা হলেও জনসাধারণের কাছে তা অধরাই থেকে গেছে। অর্থনীতিতে ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় আম্বেদকরের অর্থনৈতিক ভাবনা কত গভীর ছিল। অমর্ত্য সেন নির্দ্বিধায় বলেন, ‘Ambedkar is my Father in Economics… his contribution in the field of Economics is marvelous and will be remembered for ever.’ আসলে ভীমরাও আম্বেদকর ছিলেন এক বর্ণময় ও বহু বিষয়ে পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রতিভার ও পাণ্ডিত্যের সামগ্রিক মূল্যায়ন এই স্থিতিহীন সময়ে ভীষণভাবে জরুরি। ১৯১৫ সালে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন অর্থনীতিতে। অর্থশাস্ত্রে ডিএসসি করার প্রথম দিকে তাঁর স্কলারশিপ শেষ হয়ে যাবার ফলে তাঁকে ভারতে চলে আসতে হয়। শেষ পর্যন্ত সিডেনহাম কলেজ অব কমার্স অ্যান্ড ইকোনমিক্সে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয় অধ্যাপক হয়ে ওঠেন। ১৯২১ সালে কোলাপুরের শাহু মহারাজের সহযোগিতায় আবার ইংল্যান্ডে গিয়ে মাস্টার অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন।

Advertisement

এখান থেকেই তিনি তাঁর গবেষণা পত্র ‘The Problem of Rupee’ উপস্থাপন করেন। তাঁর অর্থনৈতিক আদর্শের মূল ছিল দেশের অধিকাংশ মানুষের হিত এবং দারিদ্র্য মোচন।

Advertisement

বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় অর্থনীতির স্বনামধন্য অধ্যাপকদের সংস্পর্শে এসে তাঁদের আদর্শকে আত্মস্থ করে তৈরি করলেন ভারতের অর্থনীতির উপযোগী নিজস্ব আদর্শ। অর্থনীতির প্রাঙ্গণে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর দর্শন কী ছিল, সেটা আগে স্পষ্ট করে নেওয়া যাক।

এ কথা অবশ্যই মানতে হবে যে, ফেবিয়ানিজমের প্রভাব তাঁর উপরে পড়েছিল যা তিনি অস্বীকার করেননি। ফেবিয়ানদের মূল বক্তব্য ছিল, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান ব্যাপক দারিদ্র্য বিমোচনে কোনও বিপ্লবের বা রাষ্ট্রের বিলুপ্তির প্রয়োজন নেই। তবে শিল্পপুঁজির মালিকানাকে ব্যক্তির হাত থেকে রাষ্ট্রের হাতে আনার প্রয়োজন আছে। ভূমি সংস্কার এবং গণতান্ত্রিকভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়।

কিন্তু আম্বেদকর কোনোভাবেই পুঁজিবাদকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রের পক্ষে কিন্তু কখনোই বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন না। এখানেই তাঁর ফেবিয়ানদের সঙ্গে মিল। আবার সম্পূর্ণ বিবর্তনের তত্ত্বে আস্থাহীন। এখানে অমিল। আসলে ভীমরাও আম্বেদকরের অর্থনৈতিক ভাবনায় ছিল মিশ্র অর্থনীতি। তিনি চেয়েছিলেন ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্য ও অবিচারের চির-অবসান এবং সেটার জন্য প্রয়োজনে সামাজিক গণআন্দোলনকে তিনি মান্যতা দেন।

আম্বেদকর মনে করতেন যে, ভারতের দুর্বল অর্থনীতির কারণ ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা। গবেষক স্বাতী দাশ চৌধুরী লেখেন, ‘এই দুর্বলতা নিরসনের উপায় নিহিত আছে গণতান্ত্রিক সংহতিবাদের মধ্যে যা অনিবার্যভাবে অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে টেনে তুলবে— যার ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক বৈষম্য বহুলাংশে দূর হবে। তিনি জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ চেয়েছেন, উচ্ছেদ চেয়েছেন ভূমিহীন কৃষকের। আর্থিক নীতি (monetary policy), জাতীয় মূলধন (Public Finance), জাতীয় ব্যয় এবং জমি বিষয়ে আম্বেদকরের রচনাগুলো নীতি নির্ধারক কল্যাণকামী বিষয়ে সুদূরপ্রসারী গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই বিষয়ে তাঁর ভাবনাগুলো একজন আপসহীন আধুনিক মনোভাবাপন্ন মানসিকতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।’

পাবলিক ফিনান্স বা জন অর্থনীতি বিষয়ক তাঁর বক্তব্য আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন যে, শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রকেই নিজস্ব সংস্থান থেকে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি এও বলেন যে, যদি বিভিন্ন রাজ্যগুলোর আর্থিক স্থায়িত্ব খর্ব করা হয় তাহলে সেটা ভারত সরকারকেই বিপদে ফেলবে। আর্থিক স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে তাঁর মতে সরকারের ঋণ নেওয়া থেকে দূরে থাকাই ভালো। তার পরিবর্তে প্রয়োজনে জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা ভালো। কিন্তু তা যেন আবার জনগণকে নিষ্পেষণের যন্ত্রণায় না পড়তে হয়।

এই কারণেই তিনি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপহীন ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগকে স্বাধীনতা দিলে ভূস্বামীরা নিজেদের ইচ্ছামতো কর বাড়াতে পারবে অন্যদিকে পুঁজিপতিরা ইচ্ছামতো শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দিয়ে বেশি শ্রম নিংড়ে নেবে। এবং এখন হচ্ছেও তাই।

বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৯০ সাল থেকে ভারতের নয়া উদারনীতির ফলে ব্যক্তি মালিকানায় একচেটিয়া অধিকারের ফলে দারিদ্র্য বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব বাড়ছে, বাড়ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা— সব মিলিয়ে আম্বেদকরের আশঙ্কাই মিলে যাচ্ছে। এই কারণেই এখনো ড. ভীমরাও আম্বেদকরের অর্থনৈতিক ভাবনা ভীষণভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাই তাঁর অর্থনৈতিক ভাবনা-চিন্তা নিয়ে চর্চা একান্তই জরুরি।

Advertisement