সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রক্রিয়া এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ কেন এখনও বিচার শেষ হয়নি, এই প্রশ্নেই এবার তোলপাড় আদালত চত্বর। দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকা মূল অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেনের জামিনের শুনানিতে উঠে এল একের পর এক অস্বস্তিকর তথ্য। আর সেই তথ্য নিয়ে রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে কড়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল কলকাতা হাইকোর্ট।
বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শেষ হলেও রায় এখনও ঘোষণা হয়নি। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণেই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে, সারদা কর্তার জেলমুক্তি এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এই মামলার শুনানিতে সুদীপ্ত সেনের আইনজীবী জানান, সারদা সংস্থার বিরুদ্ধে মোট ৩৮৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। ২০১৩ সালের ২৭ এপ্রিল গ্রেপ্তার হওয়ার পর এত বছর কেটে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া কার্যত থমকে রয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ৭৬টি মামলা নিজেদের হাতে নিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪টি মামলায় চার্জশিট দেয়। সেই মামলাগুলিতে ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন।
Advertisement
কিন্তু সমস্যার মূল জায়গা রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা বিপুল সংখ্যক মামলা। আইনজীবীর দাবি, বর্তমানে মাত্র দু’টি মামলার জন্যই আটকে রয়েছে জামিন। এই পরিস্থিতিতে আদালত সরাসরি প্রশ্ন তোলে, এত বছর পরেও কেন বিচার শুরু করা গেল না। বিচারপতি স্পষ্ট জানান, এভাবে একজন অভিযুক্তকে অনির্দিষ্টকাল জেলে আটকে রাখা যায় না।
Advertisement
এদিন শুনানির সময় উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। একটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথি দীর্ঘদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা ২০২৪ সালে উদ্ধার হয়। এই ঘটনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে আদালত জানায়, তদন্তের এই ধীর গতি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে শুধু রাজ্য পুলিশ নয়, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকেও ছাড়েনি আদালত। বিচারপতির প্রশ্ন ছিল, ‘ট্রায়াল কবে শেষ হবে? শুধু জামিন পেলেই কি দায়িত্ব শেষ? বিচার সম্পূর্ণ করার দায় কি নেই?’ এই মন্তব্যে স্পষ্ট, দেরির দায় এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই তদন্তকারীদের।
এরই মধ্যে সামনে আসে সম্পত্তি বিক্রি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। আদালতের কাছে পেশ করা রিপোর্ট অনুযায়ী, সারদার ৯টি বাংলো এবং একটি ফ্ল্যাট মাত্র ৫২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি এভাবে জলের দরে বিক্রি নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতি।
তিনি জানতে চান, এর পিছনে কারা যুক্ত। এই বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়াও অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে বলে শুনানিতে জানা গিয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রায় ২০ হাজার আবেদন জমা পড়লেও মাত্র ৫০০ আবেদন খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত অগ্রগতির নির্দেশ দিয়েছে।
আগামী ২৩ এপ্রিল মামলার পরবর্তী শুনানি। ওই দিন তদন্ত সংস্থাগুলিকে সমস্ত হিসেব-নিকেশ আদালতে পেশ করতে হবে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে দিকে মোড় নিয়েছে, তাতে দীর্ঘদিনের এই মামলায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সুদীপ্ত সেনের জেলমুক্তির পথ অনেকটাই প্রশস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
Advertisement



