• facebook
  • twitter
Tuesday, 7 April, 2026

নারী সংরক্ষণ ও আসন বৃদ্ধি

বর্তমান কাঠামো সময়োপযোগী নয়। ১৯৫১ সালে প্রথম লোকসভায় ৪৮৯টি আসন ছিল, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ কোটি।

প্রতীকী চিত্র

ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে সাম্প্রতিক সময়ে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে লোকসভার আসনসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তাঁর এই মন্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, রাজ্যগুলির বর্তমান আসন-অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে এই সম্প্রসারণের ইঙ্গিত রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
নারী সংরক্ষণ নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলেছে। অবশেষে নারী শক্তি বন্দন অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। সংসদের আসন্ন অধিবেশনে এই আইনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেই খবর। নিঃসন্দেহে এটি ভারতের গণতন্ত্রে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর প্রশ্ন— প্রতিনিধিত্বের কাঠামো, জনসংখ্যা এবং ফেডারাল ভারসাম্য।

ভারতের লোকসভা আসনসংখ্যার ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, বর্তমান কাঠামো সময়োপযোগী নয়। ১৯৫১ সালে প্রথম লোকসভায় ৪৮৯টি আসন ছিল, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ কোটি। ১৯৭৩ সালে সংবিধানের সংশোধনের মাধ্যমে আসনসংখ্যা ৫৪৫-এ নির্ধারিত হয়, যখন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৯ কোটি। আজ সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৪০ কোটিরও বেশি। এই বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় প্রতিনিধিত্বের হার অত্যন্ত কম, যা আধুনিক গণতন্ত্রের মানদণ্ডে এক বড় অসামঞ্জস্য।

Advertisement

এই বাস্তবতায় লোকসভা ও বিধানসভায় আসনসংখ্যা বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজনীয়। এটি শুধু গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে না, বরং নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্যও আনবে। কিন্তু এখানেই জটিলতার সূত্রপাত। আসনসংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি জনসংখ্যার ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস (delimitation) করা হয়, তাহলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি আশঙ্কা করছে যে তারা লোকসভায় তাদের বর্তমান অংশীদারিত্ব হারাতে পারে।

Advertisement

এই আশঙ্কার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। গত কয়েক দশকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, যেখানে উত্তর ভারতের বহু রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে শুধুমাত্র জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হলে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলি ‘শাস্তি’ পাবে, এমন ধারণা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস— রাজ্যগুলির বর্তমান আসন-অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে মোট আসনসংখ্যা বাড়ানো হবে— একটি তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিয়েছে। এটি অন্তত আপাতত কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার একটি পথ দেখায়। তবে এটিকে স্থায়ী সমাধান বলা কঠিন। কারণ, ভবিষ্যতে জনসংখ্যার পরিবর্তন, অভিবাসন, নগরায়ন, এই সমস্ত বিষয়ই প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলবে।

নারী সংরক্ষণ আইন এই বৃহত্তর পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই আসনসংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে দীর্ঘদিনের নিষ্পত্তিহীন প্রশ্ন— লোকসভা সম্প্রসারণ— আবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে শুধু প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজনৈতিক আস্থা, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যতের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা।

ভারতের সামনে আজ দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে, বিপুল যুব জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাড়ানো। অন্যদিকে, ভবিষ্যতে একটি বার্ধক্যজনিত সমাজের সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলা করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এই বৃহত্তর সমস্যারই একটি প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী, সর্বসম্মত নীতি। কেন্দ্র সরকারকে শুধু একতরফা সিদ্ধান্ত না নিয়ে সমস্ত রাজ্য, রাজনৈতিক দল এবং নীতি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। প্রয়োজন স্বচ্ছতা এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। কারণ, প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সামান্য অসন্তোষও ফেডারাল কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, নারী সংরক্ষণ আইন নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতির পদক্ষেপ। কিন্তু এর বাস্তবায়ন যেন নতুন কোনও বৈষম্য বা অসন্তোষ তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। লোকসভা আসন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের এই জটিল সমীকরণে বিচক্ষণতা, সংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে একমাত্র পথপ্রদর্শক।

Advertisement