মৌলিনাথ বিশ্বাস
কয়েক বছর আগে দোলের ঠিক আগের রবিবার ভিড়ে ঠাসা নন্দন চত্বরে বাংলা আকাদেমির সামনে ‘শতাব্দী’ যখন তাঁদের পাক্ষিক নিয়মিত নাটক উপস্থাপন করছিলেন, খুব সম্ভবত ‘মিছিল’, বেশ কিছু মানুষ ভোঁতা প্রশ্নচিহ্ন মুখে দাঁড়াচ্ছিলেন এবং কিছুক্ষণ পর চলে যাচ্ছিলেন রঙিন স্রোতে ভেসে। আবার অনেকে দেখছিলেনও। পুরো চত্বরটাই কেমন যেন ‘ওরে গৃহবাসী’-র সুরে মাতোয়ারা। মনে পড়ল, শিয়ালদহ লরেটোতে এক সন্ধ্যায়, মার্চ ২০০৩, ব্যক্তিগত কারণে সময়টা মনে আছে, শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ ‘পথসেনা’-র ‘রক্তকরবী’ দেখেছিলেন। তাঁর পায়ের কাছে ছিল আমার আসন।
Advertisement
কেন এমন হল? কেন এমন হল ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানীর সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে?
২০০২ সালে বর্তমান লেখক বাদল সরকারকে এই বিষয়ে এক সাক্ষাতকারে প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি যদি একটা নাটক করেন, নন্দন চত্বরে করেন, কেউ জানতে পারছে না। এইটা আপনি কীভাবে দেখবেন?’ উত্তরে বাদলবাবু, ‘আমার কিছু করবার নেই। … আমি বলব এই যে, আমাদের থিয়েটারকে চেপে দেওয়া হচ্ছে, আসতে দেওয়া হচ্ছে না, জানতে দেওয়া হচ্ছে না, এটার জন্য লজ্জা হওয়া উচিত বোধহয় যারা আসছে না বা যারা আসতে দিচ্ছে না, তাদের।’ দীর্ঘ দিন পরেও ছবিটা অনেকটা একই রয়ে গিয়েছে। না, পুরোটা এক হয়তো নয়; অবশ্যই কিছু পরিবর্তন এসেছে। বাদল সরকারের শতবর্ষ কিছু আলো এনে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল আমাদের। চর্চার সুযোগ।
Advertisement
ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট ১৯৬১ সালে শুরু করে আজ পর্যন্ত ২৭ মার্চ দিনটা বিশ্ব নাট্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। থিয়েটার এক ফলিত শিল্প। এর প্রথম উদ্দেশ্য জন-বিনোদন। অভিনয় এমন এক কলা যার মধ্যে সংযুক্ত থাকে নাচ-গান-সংলাপ। থাকে আলো ও শব্দ। থিয়েটারকে এক কথায় বলা যায় একটা টোটাল-প্যাকেজ। কিন্তু এর অতিরিক্ত যেটা সেটা ওই যে, ‘লোকশিক্ষা’ হয়। জনগণের মনোরঞ্জন তো হয়ই। কিন্তু তা ছাড়াও, প্রতিবাদ হয়। আমাদের বাংলা মঞ্চে নবান্ন প্রযোজনা (প্রথম মঞ্চস্থ হয় ২৪ অক্টোবর, ১৯৪৪, শ্রীরঙ্গম নাট্যশালায়) দিয়েই কি প্রতিবাদী নাটকের শুরু? প্রতিবাদ যে কত শক্তিশালী হতে পারে তা সফদার হাসমীর হত্যাই প্রমাণ করে। তাই, থিয়েটার যেমন প্রতিবাদের হাতিয়ার তেমন থিয়েটার প্রতিরোধেরও শিকার।
প্রতিষ্ঠানের, সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের। রাষ্ট্রও তার অন্যতম। এই কারণেই, প্রসিনিয়ামের থেকে আকাশের নিচে দর্শকের হাত-বাড়ালেই-ছোঁয়া-যায় নিকটে নিয়ে এসেছিল যে থিয়েটার, তার গুরুত্ব। এই উত্তর-সংবাদ সময়ে এই থিয়েটার ছড়িয়ে দিতে পারে সময়ের দাবি। মধ্যবিত্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে থিয়েটারকে ছড়িয়ে দিতে হলে, থিয়েটারের মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষাটাকে ছড়িয়ে দিতে হলে, এই আঙ্গিকটা কি আরও বেশি করে এক্সপ্লোর করা যেতে পারে? প্রয়াত অধ্যাপক-নাট্যালোচক দীপেন্দু চক্রবর্তী ‘থিয়েটার বুলেটিন’ ১৯৭৬ এ প্রকাশিত ও ‘সংস্কৃতির ক্ষয়-ক্ষতি’ গ্রন্তভূক্ত তাঁর ‘মঞ্চে যা দেখি না’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘শ্রমিক কৃষকের কথা বলে বছরের পর বছর শুধু শহুরে মধ্যবিত্তদের বিপ্লবী নাটক দেখিয়ে বেড়ানো এখন আর পাঁচটা নেশার মতোই দাঁড়িয়েছে। … কিন্তু যাদের মনে রেখে এসব, সেই মূল জনতার সঙ্গে আমাদের সংস্রব নেই, … একটা বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েও যদি প্রতি মুহূর্তে প্রগতির দোহাই দিতে হয়, তবে ‘প্রগতি’ শব্দটি একটা রসিকতা হয়ে দাঁড়ায় এবং সন্দেহ হয়, এখন তাই দাঁড়িয়েছে।’ এক্ষেত্রেও আমি মনে করি অবশ্যই অংশত বদলেছে ছবিটা। আসলে মধ্যবিত্তের জন্য মধ্যবিত্তের দ্বারা মধ্যবিত্তের নাটক— এই খোপ থেকে বের হতে হবে থিয়েটারকে।
প্রসঙ্গত, খোলা আকাশের নিচে প্রপস ছাড়া বা খুব কম প্রপস নিয়ে এই নাটক আভিনয় করা কিন্তু একইরকম অনুশীলন, শিক্ষা ও দক্ষতার প্রয়োজন। আদর্শগত অবস্থানের বিষয়টা যাঁরা ভিতরের মানুষ, তাঁরা জানেন। আমাদের মতো শৌখিন মজদুররা অনধিকারী।
নাটকের ফলিত গুরুত্ব ঠিক কোথায়, তা বলার জন্য আমি শুধু একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে শেষ করি। সম্প্রতি একটি নাট্যদল চারু মজুমদারের জীবনী আধার করে একটি প্রযোজনা করছে। সেই নাটকের প্রথম শো আকাডেমিতে ( ২৪ অগাস্ট ২০২৫), কয়েক মাস আগে। নাটক শেষ হওয়ার পর, কার্টেন কল হয়েছে, হঠাৎ দোতলা থেকে একজন দর্শক প্রণোদিত হয়ে স্লোগান দিলেন, গলা মেলালেন অনেকেই। বলতে চাইছি, পারে, নাটকই পারে।
নাট্য দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর সারা পৃথিবীর একজন নাট্য ব্যক্তিত্ব একটা বার্তা দেন। ২০০২ সালে দিয়েছিলেন আমাদের গিরিশ কারনাড। তাঁর বার্তার শেষে তিনি বলছেন:
That is why theatre is signing its own death warrant when it tries to play too safe. On the other hand, that is also the reason why, although its future often seems bleak, theatre will continue to live and to provoke.
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে নাটকের এক খোলা হাওয়া বইছে। যেহেতু বেশকিছু নাট্যব্যক্তিত্ব বিভিন্ন পদাধিকারী, তাই উৎসব, মিনার্ভার জাতীয় সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষিত হতে পারছি। আবার প্রতিরোধও হচ্ছে, অস্বীকার করে লাভ নেই। তাই বলছি, একইসঙ্গে এই থিয়েটার, যার পোশাকি নাম থার্ড থিয়েটার, এগুলোও দেখুন। নন্দন শুধু একটা চত্বরের নাম নয়, একটা শিল্প-শব্দও।
বাংলা থিয়েটারের একজন অতি সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি মনে করি, না, বাংলা থিয়েটার পুরো সেফ খেলছে না।
Advertisement



