সম্প্রতি পাশ হয়েছে ‘ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ এবং তা নিয়ে দেশজুড়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি আইনগত প্রশ্ন নয়— এটি আমাদের সমাজের মানসিকতা, মানবাধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক ধারণাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই বিলের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও, এর একাধিক বিধান গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
প্রথমেই স্বীকার করতে হয়, বিলটি কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টতা আনার চেষ্টা করেছে। এতদিন ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটির সংজ্ঞা নিয়ে যে অস্পষ্টতা ছিল, তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচয়পত্রের ব্যবস্থাও চালু করার কথা বলা হয়েছে, যা নীতিগতভাবে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সরকারের যুক্তি, এই ব্যবস্থার ফলে প্রকৃত উপভোক্তারা সুরক্ষিত হবেন এবং ভুয়ো দাবিদারদের দৌরাত্ম্য কমবে।
Advertisement
কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে মূল সমস্যার সূত্রপাত। পরিচয় নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে আমলাতান্ত্রিক ও চিকিৎসা-নির্ভর করে তোলা হয়েছে। একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হলে জেলা প্রশাসন এবং মেডিক্যাল অফিসারের সার্টিফিকেট নিতে হবে— এই ধারণা মূলত ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের অধিকারকে খর্ব করে। প্রশ্ন উঠছে, একজন মানুষের লিঙ্গপরিচয় কি তার নিজের অনুভূতি ও চেতনার বিষয় নয়? সেটি কি রাষ্ট্র বা চিকিৎসকের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে?
Advertisement
২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে স্ব-পরিচয়ের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। সেই রায় শুধু আইনি নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন এই বিল সেই মৌলিক অধিকারকে কার্যত অস্বীকার করছে। এর ফলে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি এসেছে এই বিলের শাস্তিমূলক বিধান নিয়ে। কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যা প্রথম দর্শনে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই কঠোরতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হিজড়া সম্প্রদায়, যারা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার, তারা আরও বেশি হয়রানির মুখে পড়তে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিলটি ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়কে একপ্রকার ‘চিকিৎসাগত অবস্থা’ হিসেবে দেখার প্রবণতাকে জোরদার করছে। এটি একটি গভীরভাবে ভুল ধারণা।
ট্রান্সজেন্ডার হওয়া কোনো রোগ নয়, যা নির্ণয় বা চিকিৎসা করা দরকার। এটি একজন মানুষের স্বাভাবিক পরিচয়, তার অস্তিত্বের অংশ। সেই পরিচয়কে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে বলা মানে তার মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে আঘাত করা।
বিরোধী দলগুলি যেমন এই বিলের সমালোচনা করেছে, তেমনই সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকেও আপত্তি উঠেছে। এমনকি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু বিশেষজ্ঞও এই বিল পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই আইন বর্তমান রূপে কার্যকর হলে তা সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে— আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে চাই, নাকি সামাজিক রক্ষণশীলতার চাপে পড়ে পিছিয়ে যেতে চাই? ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় বরাবরই সমাজের প্রান্তিক অংশে অবস্থান করেছে। তাদের জন্য আইন হওয়া উচিত সহায়ক, মুক্তিদায়ক— সংকোচনমূলক নয়।
সরকারের উচিত এই বিলটি নিয়ে পুনরায় ভাবনা-চিন্তা করা। তাড়াহুড়ো করে আইন পাশ করাই শেষ কথা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মতামত, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে একটি আরও মানবিক ও সংবেদনশীল আইন তৈরি করা জরুরি।
আইন যদি মানুষের জন্য হয়, তবে সেই আইনের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সম্মান। ট্রান্সজেন্ডারদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়। বরং তাদের মতো দীর্ঘদিন অবহেলিত একটি সম্প্রদায়ের জন্য আরও বেশি সহমর্মিতা ও সচেতনতা প্রয়োজন। সরকার যদি সত্যিই তাদের কল্যাণ চায়, তবে এই বিল স্থগিত রেখে একটি উন্নত, অধিক মানবিক সংস্করণ নিয়ে আসাই হবে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ।
Advertisement



