ভোট ঘোষণা হতেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেভাবে একের পর এক পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিককে সরানো হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে হাইকোর্টে। কমিশনের এই তুঘলকি সিদ্ধান্তকে কার্যত চ্যালেঞ্জ করে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে প্রশ্ন তোলেন, রাজ্যে কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে? কারণ একমাত্র রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তবেই এভাবে বদলি করা যায়। সোমবার মামলার শুনানিতে এই আইনজীবী আরও প্রশ্ন তোলেন, সমস্ত অফিসারকে সরিয়ে দেওয়ায় যদি কোনও বিপর্যয় হয়, তাহলে কে সামলাবে? অন্যদিকে, কমিশনের আইনজীবী জানান, অবাধ এবং সুষ্ঠু ভোটের জন্যই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলায় ভোট ঘোষণার পরেই নজিরবিহীনভাবে বদল করা হয়েছে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মীনাকে। ডিজি, এডিজি-সহ পুলিশ ও প্রশাসনের অধিকাংশ পদেও রদবদল করা হয়েছে। এই গণবদলি নিয়ে ইতিমধ্যে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনকে একযোগে আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেছেন, কমিশন মধ্যরাতে গুপ্ত তাণ্ডব চালিয়েছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগের। এভাবে ইচ্ছামতো, রাতারাতি একের পর এক পদস্থ পুলিশ কর্তা এবং আমলাকে বদলির জেরে বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
Advertisement
ভোট ঘোষণা হতেই রাজ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকদের অপসারণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী অর্ক নাগ। সোমবার কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। মামলায় তৃণমূলের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ১৬ জন আইএএস অফিসার, ৬৩ জন পুলিশ অফিসারকে সরানো হয়েছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ১৩ জন পুলিশ সুপারকে।
Advertisement
বহু দক্ষ ও অভিজ্ঞ অফিসারকে নির্বাচনের কাজে কোনও দায়িত্বই দেওয়া হয়নি। মুখ্যসচিবকে সরানো হলেও তাঁকে কোনও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ রাজ্যের সব সমস্যা মুখ্যসচিব দেখেন। এর পরই কল্যাণ প্রশ্ন তোলেন, রাজ্যে যদি কোনও বড়সড় বিপর্যয় হয়, তাহলে কে সামলাবে? কারণ এই মুহূর্তে প্রশাসনিক কাজে রাজ্যে কোনও দক্ষ ও অভিজ্ঞ অফিসারই নেই। কল্যাণ আদালতকে আরও জানান, নির্বাচনের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিব যুক্ত নন। অথচ তাঁকে অন্য রাজ্যে পাঠানো হয়েছে। জাভেদ শামিমের মতো দক্ষ অফিসার এমনকী, মাত্র এক মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকারকেও সরানো হয়েছে।
আইনজীবী কল্যাণের প্রশ্ন, কমিশন কি ইচ্ছামতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে? এদিনের শুনানিতে কল্যাণ অভিযোগ করেন, এসআইআরের সময় থেকেই রাজ্যের আধিকারিকদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে কমিশন। সেই সময় আধিকারিকদের কাজ নিয়ে কোনও অসন্তোষ জানানো হয়নি কমিশনের তরফে। কিন্তু ভোট ঘোষণার পরই অপসারণ করা হচ্ছে। কল্যাণের দাবি, বাংলা ছাড়া আর কোনও রাজ্যে এমন হয়নি। এই মামলায় রাজ্যের হয়ে সওয়াল করেন অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত। বদলির ধরনের বিরোধিতা করে কিশোর প্রশ্ন করেন, কমিশনকে কি এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনের কাজে যুক্ত নন, এমন আধিকারিকদেরও অপসারণ করতে পারবে?
কল্যাণের তোলা প্রশ্নের জবাবে কমিশনের আইনজীবী জানান, অবাধ এবং সুষ্ঠু ভোট পরিচালনার জন্য এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। এই সব সিদ্ধান্তের পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। পাঁচটি রাজ্যে ভোট হচ্ছে এটা ঠিক, কিন্তু সব জায়গার পরিস্থিতি এক নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কমিশনের আইনজীবী আরও বলেন, যে সব রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে সেখানে অফিসারদের বদলির তালিকা তাঁরা আদালতে জমা দিতে প্রস্তুত আছেন। পাশাপাশি পাঁচ রাজ্যের ভোটের জন্য বিভিন্ন রাজ্য থেকে নিয়ে আসা অফিসারদের তালিকাও তাঁরা দেবেন।
সেই তালিকা দেখলেই বিষয়টি আদালতের কাছে স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি কমিশনের আইনজীবীর দাবি, রাজ্য সরকারের হয়ে সওয়াল করেন এমন একজন আইনজীবী জনস্বার্থ মামলা করতে পারেন না। রাজ্য সরকারের আইনজীবীদের প্যানেলেও তাঁর নাম রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ সওয়াল চললেও, সোমবার রাজ্যের আমলা এবং পুলিশকর্তাদের বদলি সংক্রান্ত মামলার শুনানি শেষ হয়নি। বুধবার ফের এই মামলার শুনানির হবে।
Advertisement



