ভারতের আকাশপথে যাত্রা গত এক দশকে যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে যাত্রীদের অসন্তোষও। টিকিটের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও, একের পর এক ‘অতিরিক্ত পরিষেবা’-র নামে যাত্রীদের পকেট থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার প্রবণতা এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে অসামরিক বিমান মন্ত্রক এবং ডাইরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন বা ডিজিসিএ-র সাম্প্রতিক নির্দেশ কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে।
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, অনলাইনে চেক-ইন করা যাত্রীদের অন্তত ৬০ শতাংশ আসন কোনও অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই দিতে হবে। একই পিএনআর-এ থাকা যাত্রীদের একসঙ্গে বসানোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। শুনতে সাধারণ মনে হলেও, বাস্তবে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কম নয়। কারণ, এতদিন যে পরিষেবাগুলি স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া হত, সেগুলিই ধীরে ধীরে ‘পেইড অপশন’-এ পরিণত হয়েছিল।
Advertisement
ভারতের বিমান পরিষেবার বাজার এখন কার্যত কয়েকটি বড় সংস্থার দখলে। ইন্ডিগো এবং এয়ার ইন্ডিয়া— এই দুই সংস্থাই যাত্রী পরিবহনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবস্থায় প্রতিযোগিতা থাকলেও, তার প্রভাব সবসময় যাত্রীদের পক্ষে যায় না। বরং বড় সংস্থাগুলির নির্ধারিত নীতিই অনেক সময় পুরো বাজারের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, আসন বাছাইয়ের জন্য বাড়তি চার্জ নেওয়ার মতো প্রথা একসময় ব্যতিক্রম হলেও, এখন তা নিয়মে পরিণত হয়েছে।
Advertisement
বিমান সংস্থাগুলির যুক্তি অবশ্য আলাদা। তাদের দাবি, মূল ভাড়া কম রাখতে গিয়েই পরিষেবাগুলিকে আলাদা করা হয়েছে। যাত্রীরা চাইলে বিনামূল্যে র্যান্ডম আসন নিতে পারেন— অর্থাৎ, আগেভাগে আসন বেছে নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বলছে, সেই ‘র্যান্ডম’ বণ্টন সবসময় স্বচ্ছ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের আলাদা আসন দেওয়া হয়, কিংবা সুবিধাজনক আসন পেতে হলে বাড়তি টাকা দেওয়ার চাপ তৈরি হয়। ফলে, এই প্রক্রিয়া কার্যত এক ধরনের নীরব বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে।
এখানেই নিয়ন্ত্রকের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে ওঠে। ডিজিসিএ-র নতুন নির্দেশ সেই জায়গাতেই আঘাত করেছে। আসনের বড় অংশকে বিনামূল্যে রাখার নির্দেশ আসলে এই বাড়তি আয়ের সহজ পথকে কিছুটা সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা। এর ফলে অন্তত যাত্রীরা একটি ন্যূনতম অধিকার ফিরে পাবেন, যা আগে স্বাভাবিক পরিষেবা হিসেবেই গণ্য হত।
তবে এই হস্তক্ষেপের গুরুত্ব শুধু আসন বণ্টনেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্লাইট দেরি, বাতিল এবং ওভারবুকিং নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি একাধিকবার সামনে এসেছে। বিশেষ করে গত বছরের নভেম্বরে ইন্ডিগোর বহু ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ঘটনায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা এই খাতের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পরেই যাত্রী-অধিকার নিয়ে আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে।
নতুন নির্দেশে তাই শুধু আসন নয়, বিলম্ব বা বাতিলের ক্ষেত্রে যাত্রীদের কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, কীভাবে তথ্য জানানো হবে— সেসব বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। পাশাপাশি ক্রীড়া সরঞ্জাম বা বাদ্যযন্ত্র বহন, পোষ্য নিয়ে ভ্রমণ, এমনকি যাত্রীদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শনের মতো বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষায় তথ্য দেওয়ার নির্দেশ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ— কারণ বিমান যাত্রা এখন আর কেবল শহুরে উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
তবে, এখানেই শেষ নয়। বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—এই নিয়মগুলি কতটা বাস্তবে কার্যকর হবে? ভারতের মতো বিশাল এবং দ্রুত-বর্ধনশীল বাজারে নিয়ম তৈরি করা যতটা সহজ, তা প্রয়োগ করা ততটাই কঠিন। অতীতে বহু ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, কাগজে-কলমে থাকা নিয়ম বাস্তবে ঠিকমতো মানা হয় না। নিয়ন্ত্রকের নজরদারি দুর্বল হলেই সংস্থাগুলি পুরনো পথে ফিরে যায়।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বিমান সংস্থাগুলি ব্যবসা করে, তাদের লাভের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই লাভের জন্য যদি যাত্রীদের মৌলিক সুবিধাগুলিকেই ‘অতিরিক্ত পরিষেবা’ হিসেবে বিক্রি করা হয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই। পরিষেবা খাতের মূল ভিত্তি হল আস্থা, আর সেই আস্থা নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে পুরো ব্যবস্থার উপর।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে একটি সংশোধনমূলক উদ্যোগ বলেই দেখা যেতে পারে। এটি হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু অন্তত একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, যাত্রীদের স্বার্থকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাজার চালানো যাবে না।
সবশেষে, বিষয়টি একটি মৌলিক প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়— বিমান পরিষেবা কি শুধুই ব্যবসা, না কি এটি একটি জনপরিষেবা? উত্তরটি হয়তো মাঝামাঝি কোথাও। কিন্তু যে দিকেই ঝোঁক থাকুক, যাত্রীদের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করে কোনও ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না। ডিজিসিএ-র এই উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এল। এখন দেখার, আকাশপথের এই পরিবর্তন মাটিতে কতটা দৃশ্যমান হয়।
Advertisement



