সংঘাতের উত্তাপ যখন পশ্চিম এশিয়ার আকাশে ক্রমেই ঘনীভূত, তখন তার তাপপ্রবাহ যে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক পরিসরেও পৌঁছবে— তা অনুমেয় ছিল। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রকের অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভারত এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পথে হাঁটছে— যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই মাপা, কিন্তু খুব ঝুঁকিপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালী, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের নাড়ি, আজ কেবল একটি জলপথ নয়, বরং আন্তর্জাতিক শক্তির সংঘর্ষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে আমেরিকা-ইজরায়েল জোট, অন্যদিকে ইরান— এই দ্বন্দ্বে ভারত কার্যত মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করছে। ভারতের দুই পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারের নির্বিঘ্নে পারাপার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা কেবল একটি সামুদ্রিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বহুমাত্রিক সম্পর্কের পরীক্ষাক্ষেত্র।
Advertisement
জয়শঙ্করের বক্তব্য, ‘এটা দেনা-পাওনার বিষয় নয়’, বস্তুত এক গভীর কূটনৈতিক বার্তা। এখানে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও সভ্যতার সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় এটি ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’-রই আরেক প্রকাশ, যেখানে ভারত কোনও শিবিরে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে না দিয়ে, নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
Advertisement
একই সঙ্গে, পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের মন্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। আমেরিকার তরফে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সম্ভাব্য অনুরোধ প্রসঙ্গে তাঁর ‘দ্বিপাক্ষিক স্তরে আলোচনা হয়নি’ মন্তব্যটি নিছক তথ্য নয়, বরং এটি একটি সচেতন দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল। ভারত এখানে স্পষ্টতই কোনও সামরিক জোটে জড়াতে চাইছে না, বরং সংলাপ ও সংযমের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
তবে এই নীতির রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ যে অভিযোগ তুলেছেন— ভারত আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়— তা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ব্রিকস মঞ্চে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ২০২৫ সালে ইরান-সংক্রান্ত বিষয়ে ব্রিকসের যৌথ অবস্থান এবং ২০২৬ সালে ভারতের নীরবতা, এই বৈপরীত্য রাজনৈতিক বিতর্ককে উসকে দিচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জ, তা বহুমুখী। প্রথমত, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, যার বড় অংশ নির্ভর করে পশ্চিম এশিয়ার উপর। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষা, যাঁদের একটি বড় অংশ ওই অঞ্চলে কর্মরত। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য— যেখানে আমেরিকা, ইজরায়েল, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো শক্তিগুলির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ— ভারতের সক্রিয় মধ্যপন্থারই প্রতিফলন। এটি নিছক ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ নয়। বরং একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যেখানে ভারত নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য, সংলাপনির্ভর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য কতদিন বজায় রাখা সম্ভব? আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস বলে, দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষতা বা সমদূরত্ব বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন সংঘাত তীব্র হয়। ভারত কি সেই চাপ সামলাতে পারবে, নাকি একসময় তাকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে বাধ্য হতে হবে?
এই মুহূর্তে দিল্লির কৌশল স্পষ্ট— সংঘাত এড়ানো, কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখা। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে, সব চালই নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু বর্তমান সঙ্কট সামলানো নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃঢ় কূটনৈতিক রূপরেখা তৈরি করা।
হরমুজ প্রণালীর ঢেউ তাই আজ শুধু জাহাজ নয়, ভারতের কূটনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও দোলাচলে ফেলছে। এই দোলাচলের মধ্যেই ভারতের আসল পরীক্ষা।
Advertisement



