• facebook
  • twitter
Sunday, 15 March, 2026

মৃত্যুর মর্যাদা

ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে আইনি বিতর্ক নতুন নয়। ২০১১ সালে অরুণা শানবাগের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট সক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল।

প্রতীকী চিত্র

ভারতে ‘ইউথানেশিয়া’ বা স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে আলোচনা বহুদিনের। নৈতিকতা, ধর্মীয় বিশ্বাস, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আইনের জটিল সংযোগে এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। সেই কারণেই ভারতে এই বিষয়ে অগ্রগতি সবসময়ই ধীর। তবু ধীরে ধীরে যে একটি মানবিক ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের রায়।

গত ১১ মার্চ ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ৩২ বছর বয়সী হরিশ রানার ক্ষেত্রে ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’ বা ‘পরোক্ষ মৃত্যু’র অনুমতি দিয়েছে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে তিনি স্থায়ী নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর মস্তিষ্কে সচেতনতার কোনও লক্ষণ ছিল না। তিনি সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম যন্ত্র এবং চিকিৎসা-সহায়তার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। আদালতের নির্দেশে তাঁর ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা-সহায়তা প্রত্যাহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় আইনি ইতিহাসে এ ধরনের অনুমোদন এই প্রথম।

Advertisement

ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে আইনি বিতর্ক নতুন নয়। ২০১১ সালে অরুণা শানবাগের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট সক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে সেই সময়ই আদালত ‘পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু’র ধারণাকে সীমিতভাবে স্বীকৃতি দিয়ে কিছু নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছিল। পরে আইন কমিশনও এই বিষয়ে সুপারিশ করে। অবশেষে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’-কে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অন্তর্গত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করে।

Advertisement

হরিশ রাণার মামলার রায় সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় রোগীর মর্যাদা ও স্বাচ্ছন্দ্য রক্ষা করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে রোগীর যন্ত্রণা কমানোর জন্য যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল জীবন-মৃত্যুর নয়, মানুষের মর্যাদার। দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় যন্ত্রের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা অনেক সময় মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। আদালত সেই বাস্তবতাকেই স্বীকার করেছে।

একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্দেশিকা সম্পর্কে প্রথম শ্রেণির বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের অবহিত করার জন্য উচ্চ আদালতগুলিকে বলা হয়েছে। কারণ, পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দুটি আলাদা মেডিক্যাল বোর্ডের মতামত প্রয়োজন হয় এবং তাদের সিদ্ধান্ত ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নথিভুক্ত করতে হয়। আদালত স্পষ্টতই বুঝতে পারছে যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের আবেদন আরও বাড়তে পারে এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে সেই অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে হবে।

তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে আইনি অধিকার বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অসমতা একটি বড় সমস্যা। বহু মানুষের কাছে আদালতে যাওয়া কঠিন, অনেকেই এই অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে এই ধরনের মানবিক সিদ্ধান্তের সুফল সমাজের একটি সীমিত অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো আইন প্রণয়নের অভাব। সুপ্রিম কোর্ট বারবার সংসদকে এই বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট আইন তৈরির পরামর্শ দিয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত তা হয়নি। আদালতের নির্দেশিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আইনের বিকল্প হতে পারে না। একটি সংসদীয় আইন থাকলে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ, সুসংহত এবং সর্বজনগ্রাহ্য হতে পারে।

ভারতে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মামলার রায় নয়, এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক ও আইনি বিবর্তনের চিহ্ন। জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি মৃত্যুর মুহূর্তেও মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা সভ্য সমাজের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন সংসদের সক্রিয় ভূমিকা। আদালতের নির্দেশিকাকে ভিত্তি করে একটি সুস্পষ্ট ও মানবিক আইন প্রণয়ন করা হলে তবেই এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি প্রকৃত অর্থে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছতে পারবে।

Advertisement