একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে আমরা প্রায়ই মানবসভ্যতার এক উন্নত পর্যায় বলে মনে করি। একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জাগ্রত কণ্ঠ— প্রায় সব মিলিয়ে মনে হয় মানুষ যেন দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে এক নতুন নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু ইতিহাস সে কথা বলে না। ইতিহাস আমাদের বারবার স্মরণ করায় যে এই মেকি সভ্যতার তথাকথিত আত্মবিশ্বাস অনেক সময়ই ভঙ্গুর। কারণ শক্তির রাজনীতি যখন প্রাধান্য পায়, তখন সভ্যতার আবরণ খুব দ্রুত খুলে পড়ে এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তির কঙ্কালসার রূপ সামনে এসে দাঁড়ায়।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল যে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, তা আমাদের সামনে নৈতিকতার এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য পৃথিবীতে বাস করছি, না-কি সভ্য হওয়ার ঢং করছি? আমরা কি আচরণে দিক দিয়ে এখনো বর্বর?চিন ইতিমধ্যেই এই হামলাকে ‘জংলি কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের বাক্য প্রয়োগ অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই নিকৃষ্টতম ঘটনাকে আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
Advertisement
যখন একটি রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বা যখন প্রকাশ্যে বলা হয় যে, ইরানের কোনও নতুন নেতা নির্বাচিত হলেই তাঁকেও হত্যা করা হবে— তখন সেটি কি আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে পড়ে, নাকি সভ্যতার সমস্ত নৈতিক সীমা ভেঙে দেওয়া এক ক্ষমতার উন্মত্ততা?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হয়।মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রস্তরযুগ ছিল সবচেয়ে প্রাচীন সময়গুলোর একটি। এই যুগ শুরু হয় প্রায় ২৬ লাখ বছর আগে এবং শেষ হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ সালে। তখন মানুষের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। আইন-আদালত কোন কিছুই ছিল না।
Advertisement
মানুষ ছোট-ছোট গোষ্ঠী বা গোত্রে বসবাস করত এবং তাদের জীবন ছিল কঠিন ও অনিশ্চিত। তবুও সেই আদিম সমাজে কিছু সামাজিক নিয়মকানুন ছিল। যেমন গোত্রের খাদ্য চুরি করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা বা অকারণে সহিংসতা চালানো। এই অপকর্ম গুলিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। গোত্রের প্রবীণরা বা গোষ্ঠীপতি সেই অপরাধের বিচার করতেন। শাস্তি হতে পারত সামাজিক বর্জন, গোত্র থেকে বহিষ্কার বা সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড। অর্থাৎ প্রস্তরযুগের মানুষও শাস্তি দেওয়ার আগে কোনও-না-কোনও সামাজিক বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতেন।
আজ যখন আধুনিক রাষ্ট্রের নেতারা বিচার ছাড়াই অন্য দেশের নেতৃত্বকে বীরদর্পে হত্যার ঘোষণা করে বসেন, তখন প্রশ্ন জাগে— সভ্যতার দাবি করা এই যুগ কি সত্যিই প্রস্তরযুগের চেয়ে উন্নত?আমরা প্রায়ই কোনো নিষ্ঠুর আচরণকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে উল্লেখ করি। ইতিহাসে মধ্যযুগ শুরু হয় পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর, অর্থাৎ ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে। এর সমাপ্তি ধরা হয় ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের পতনের মাধ্যমে; কেউ-কেউ আবার ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারকে মধ্যযুগের শেষ হিসেবে মনে করেন।
মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ বলা হলেও বাস্তবে সে সময়েও সমাজে আইন ও বিচারব্যবস্থা ছিল। রাজা, সামন্তপ্রভু বা ধর্মীয় আদালত— যে কোনো কর্তৃত্বই হোক না কেন— শাস্তি দেওয়ার আগে কোনও-না- কোনও বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো। ক্রুসেডের মতো রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধও কোনও-না-কোনও যুক্তি ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছিল। অথচ আজকের পৃথিবীতে অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হয় এমনভাবে, যেখানে কোনও আন্তর্জাতিক তদন্ত, কোনও নিরপেক্ষ বিচার বা কোনও বৈধ অনুমোদনের সুযোগই
থাকে না।
ইরান সংকটে এই প্রশ্নটি আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। ইরানের শীর্ষ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর খবর এবং পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনের ঘটনাকে ঘিরে যে বক্তব্য সামনে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইজরায়েলি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বলা হয়েছে যে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা যেই হোক না কেন, তাঁকেও হত্যা করা হবে।
এই ধরনের ঘোষণা আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হত্যার নীতি আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির বিরোধী।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার তিনটি প্রধান লক্ষ্য ঘোষণা করেছে— ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূল করা এবং ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো।
প্রথম দুটি লক্ষ্য সামরিক কৌশলের অংশ হতে পারে, কিন্তু তৃতীয় লক্ষ্য— সরকার পরিবর্তন— একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। একটি দেশের জনগণ কী ধরনের সরকার চাইবে, সেটি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিষয়। বহিরাগত শক্তি যদি সেই সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানায় বা সামরিক শক্তি দিয়ে তা উৎখাত করার চেষ্টা করে, তবে সেটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য একটি বিপজ্জনক নজির হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে এসে পড়ে।
গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে আবার বলা হলো যে ইরান নাকি পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দেয়। আধুনিক বিশ্বরাজনীতিতে সত্য অনেক সময় ক্ষমতার কৌশলের কাছে পরাজিত হয়— এই অভিযোগ নতুন নয়।ইজরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা বুঝতে হলে তার জন্ম ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের। একই সঙ্গে পরিকল্পনা ছিল যে প্যালেস্তাইন নামের আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাষ্ট্র এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে কেন বিশ্বরাজনীতির অনেক শক্তি ইজরাইলের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়।
ইরানের সামরিক কৌশলও এই সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও তারা মিসাইল প্রযুক্তি, ড্রোন এবং গেরিলা যুদ্ধের ধারণার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তি নিয়ে যে আলোচনা এখন বিশ্বমাধ্যমে চলছে, তা পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সমীকরণকে নতুনভাবে বদলে দিতে পারে।
এই সংঘাতের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী ঘোষণা করে যে এই প্রণালী দিয়ে কোনও জাহাজ চলাচল করতে পারবে না এবং কয়েকটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটে। ফলে শতাধিক জাহাজ নিরাপত্তাজনিত ভয়ে উপসাগরের বাইরে নোঙর করে থাকে এবং প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য।
এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ইরানের ভূগোলও এই সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে। প্রায় ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশ পাহাড়, মরুভূমি এবং দুর্গম অঞ্চলে পূর্ণ। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে কঠিন ভূগোল বড় শক্তিগুলোকেও বিপদে ফেলেছে বারে বারে। আফগানিস্তানের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে দশ বছর যুদ্ধ করেও শেষ পর্যন্ত সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বিশ বছর অবস্থান করার পর অবশেষে সরে যায়। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিমানশক্তি দিয়ে অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও কোনও দেশের জনগণের প্রতিরোধকে সহজে দমন করা যায় না।এই সংঘাতে চিন ও রাশিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না, কিন্তু ইরানকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন দিচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, চিন এই সংঘাতকে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি ব্যস্ত থাকবে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ওপর চাপ তত কমবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা কোনও সামরিক অভিযানের জন্য নিজেদের বন্দর বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি এবং ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক— বিশেষ করে চাবাহার বন্দরের গুরুত্ব।
সবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়— এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? যুদ্ধের ইতিহাসকে পর্যবেক্ষণ করলে জানা যায় যে, যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, শেষ করা তত কঠিন।
প্রতিটি যুদ্ধ একসময় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে কোনও পক্ষই সহজে পিছু হটতে পারে না। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইলও নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের আগে থামতে চাইবে না।এই পরিস্থিতিতে মানবসভ্যতার সামনে আবার সেই পুরোনো প্রশ্নটি ফিরে আসে— আমরা কি সত্যিই ইতিহাস থেকে কিছু শিখেছি?মানুষ প্রযুক্তিতে যত উন্নতই হোক, যদি নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রশ্নে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে সভ্যতার ভবিষ্যৎ কখনোই নিরাপদ নয়। সম্ভবত এই কারণেই ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করে দেয় এই বলে যে— সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় শক্তিকে সংযত রাখার ক্ষমতায়।
Advertisement



