পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হল রাজ্যপাল পদে আচমকা পরিবর্তনকে ঘিরে। বৃহস্পতিবার হঠাৎই ইস্তফা দিলেন রাজ্যের রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস। রাষ্ট্রপতি ভবন দ্রুত তাঁর ইস্তফা গ্রহণ করার কথা জানায়। তার পরেই কেন্দ্র ঘোষণা করে, নতুন রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আর এন রবি। ভোটের মুখে এই পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল একটি সাংবিধানিক পদ। কেন্দ্রের প্রতিনিধি হলেও রাজ্যপালের ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ ও সংযত। কিন্তু গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যপালদের ভূমিকা নিয়ে বারবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী- শাসিত রাজ্যগুলিতে রাজ্যপাল ও নির্বাচিত সরকারের সংঘাত প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই পরিবর্তন নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটেই কেন্দ্র নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে। এমনকি কিছু বিরোধী নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পরিস্থিতি জটিল হলে রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
Advertisement
এই প্রসঙ্গে বিহারের নির্দল সাংসদ পাপ্পু যাদব আরও দূরগামী অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে একটি নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা থাকতে পারে। মালদহ, মুর্শিদাবাদ বা সীমাঞ্চল অঞ্চলের মতো এলাকার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রাজ্যপাল পরিবর্তন করা হয়েছে। যদিও এই দাবি এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি সূত্রে নিশ্চিত হয়নি, তবুও এমন অভিযোগ থেকেই বর্তমান রাজনৈতিক অবিশ্বাসের মাত্রা কতখানি, তা বোঝা যায়।
Advertisement
নতুন রাজ্যপাল আর এন রবির অতীত রেকর্ড এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করেছেন এবং পরে নাগাল্যান্ড ও তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে তাঁর কার্যকাল বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়েছিলেন তিনি। বিধানসভায় পাস হওয়া একাধিক বিল দীর্ঘদিন আটকে রাখার কারণে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছিল। সরকারি ভাষণ না পড়ার মতো নানা ঘটনার কারণে রাজ্যপাল ও তামিলনাড়ুর নির্বাচিত সরকারের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছিল।
এই কারণেই ডিএমকে-র রাজ্যসভার সাংসদ পি উইলসন সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যে, রবি যেখানে যান সেখানে সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাঁর এই মন্তব্য অবশ্য রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষ্য হিসেবেই দেখা উচিত, কিন্তু তাতে যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন রয়েছে তা অস্বীকার করা কঠিন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ও এই পরিবর্তন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভোটের আগে কেন্দ্রের এই একতরফা সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের মতে, আগের রাজ্যপাল আনন্দ বোস অনেক ক্ষেত্রেই সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছিলেন এবং বিধানসভায় রাজ্য সরকারের লেখা ভাষণ পড়ার মতো সাংবিধানিক রীতি বজায় রেখেছিলেন। সেই তুলনায় নতুন রাজ্যপালের অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলেই তাঁদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে বিজেপি শিবির অবশ্য এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখাতে চাইছে। তাদের মতে, অভিজ্ঞ প্রশাসক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে আর এন রবি রাজ্যের সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।
কিন্তু বাস্তবতা হল, ভারতের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে রাজ্যপালদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই পদ রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল পরিবর্তন তাই নিছক একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। ভবিষ্যতে এই পরিবর্তন রাজ্য-কেন্দ্র সম্পর্ক এবং নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সংবিধান ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির মর্যাদা রক্ষা করা এই মুহূর্তে সব পক্ষেরই দায়িত্ব।
Advertisement



