রহস্য
শৈলেন কুমার দত্ত
লোকটা জানত বুকপকেটের নিচে হৃদয় নামক এক অস্তিত্ব থাকে জানত ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় আর এযুগের চাঁদ হল কাস্তে
Advertisement
উঠোনে কুয়োর জলে যে আস্ত চাঁদ পড়ে আছে সে খবরও তার কাছে ছিল আর অদ্ভুত এক আঁধারের রহস্যও তাকে অস্থির করে রাখত
Advertisement
তবু সে শত চেষ্টা করেও কবিতা লিখতে পারেনি
সে চেয়েছিল প্রেমের মতো সহজভাবে জীবনযাপনের মতো সরলভাবে
কবিতা ঠিক তার রহস্যময় পথে সরে গেছে …
দুঃখ বাজাতে বাজাতে
আমিও চলে যাই পরিব্রাজনে
বিশ্বজিৎ লায়েক
১
কোথায় যাচ্ছে মন নির্জন মাউথ অর্গ্যান
দাঁড়াও। কথা বলব বলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল নতুন গৃহস্থালি
কার সঙ্গে মিশছ আজ
আলো নেই বলে
এত কান্নার আঁধার
ডাকছে সকাল। ডানা ঝাপটানোর খবর
মোহানা আর কতদূর? কতদূর এই ভাগাভাগি খেলা?
বলো বাকি পথ হাত ধরে যাবে?
২
এটা কি অন্য কারো এই চারদিকে ছড়ানো ছেটানো ঘাম ও নুন
রাস্তা এ টুকুই দূরে জয়োৎসব, দূরে পরিশ্রম
ডাকছ? যাব? জনম-ভর দৌড়ে গেছি এক সিলেবাস ছুঁয়ে
অন্য সিলেবাসে
মায়া ত্যাগ করে আর কতদূর নিয়ে যাবে
এবার আমাকে ধ্বংস করো
বিকেল এসেছে খেলতে, মাথার ভেতর চন্দ্রাঘাত
মনসুন ঢুকছে, এসো, আদিম বর্ষায়
খেলবে বলেছে ডুবে যাওয়া সামান্য যতিচিহ্ন
সম্পর্কের রোদ্দুর পেরিয়ে যতই রঙ ঢালো
সেই রঙ আর পৌঁছবে না মুছে যাওয়া গানের খাতায়
৩
কী বলব? এইভাবে শেষ করে ফেললাম বেসামাল সহস্র পুরাণ
অবিরল নামছে রাত ঘন মেঘের, ‘ঋ’
তার পাশে ফুটে আছে সুইসাইড নোট
জুয়াড়ির মতো বোবা চাঁদ
অক্ষর জ্বালিয়ে শান্তি দেবে কে?
সেঁকা মাংস, রুটি
গভীর খিদের ভেতর বহতা নদী
না, আর কোনো কথা নয়
ঘনিষ্ঠ হও
জেনো অগ্রন্থিত মুদ্রা নয়, বশীভূত এই অস্ত্র প্রকৃত ঘাতক
৪
কোথায় কী রাখছি? জলের অতল, পোড়া পাঁজর
তার হাতে কি ছিল ঘরের চাবি গড়িয়ে নামল এতো আলো
নুয়ে পড়ে আছে তার সমস্ত সকাল
জলের মতন এখন মিথ্যে প্রস্তুতি, মিথ্যে সুখ
বয়ে যাচ্ছে ছায়া মানুষের কথা
আমাকে পোড়াও, আমাকে পোড়াও
অনেক দিন পর আবার বাড়ি ফিরছি
‘দেখ, একদিন ঠিক শুভ ফিরবে তোর কাছে’
বাবা চলে যাবার পর এ কথা জলের নীচে শূন্য হয়ে বাজে
৫
হাত কি পৌঁছবে সেখানে? ঝুঁকে পড়ার আগেই বললে
কিচ্ছু হবে না
কাকে কী বলব এখন? সমস্ত অসুখ তো আমারই
এত এত তেষ্টা, দধিকর্ম, বিসর্জন
এই সকল আমারই অলৌকিক গন্ধ
কুহকিনী আমাকে জাগাও, অন্নে পরমান্নে
দুঃখ বাজাতে বাজাতে আমিও চলে যাই পরিব্রাজনে
শোক
সম্পা পাল
কবিতার ভেতর এখানে কোনও কবিতা নেই!
নতুন ভূগোলের দিকে শুধু একঝাঁক উদ্বাস্তু পাখির উড়ে যাওয়া!
এখানেই থেমে গেছে স্বচ্ছ নদী ও তরুণ সন্ন্যাসী।
ভেতরের কল্পনা মেপে নিয়েছে বুলেটে বিদ্ধ হওয়া ভারতবর্ষ।
এ দেশ শোকের ছায়ায় রাতের গাঢ় অন্ধকার মাপে!
তবু শীতকাল আসে
বড় হয় মাঘ মাসের দাবি…
শোক আসলে বোধ ও বোধিসত্ত্ব…
তবু দাগ থেকে যায়
বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
হাতে কিছু নেই, কোনো মায়া, জাদুমন্ত্র, নির্বাচিত লোভ
তবু এই এত দূর পথ
একলা নির্জন রাতে হেঁটে হেঁটে এলে?
এই শ্রম অনিবার্য ক্লান্তিহীন
অবান্তর ভেবে তাকে সম্মানজনক দূরে
সরে এসে তাচ্ছিল্য করেছো।
সময়ও তো থেমে নেই গতির উচ্ছ্বাস নিয়ে কেবল লাফায়
দূরত্বের সাথে তার মৈত্রী সেও সমানুপাতিক
ধুলো জমে নিরুপায় বৃষ্টির ভেতর
তবু দাগ থেকে যায়, জলে তা মোছে না।
দাম
বৈশালী সেন
কেমন করে শিকড়ের উৎসব
টেনে ধরে নাভিমূল
কেমন করে দাগেরা রেখে যায়
ক্ষোভ…
চিহ্নের হাতিয়ার
হাত পা নখের ডগায়
লিখে দেয় বায়বীয় কান্নার দাম
এখানে…
না-লেখা কথারা
দেবাশিস ঘোষ
না-লেখা কথার পিঠে বসে থাকে নখ, দাঁত এবং বিরহ
আয়নায় একা একা, সারাদিন, মুখের সকল ভাঁজ,
সময়ের বুদবুদ ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেঙে যাওয়া
আকাশে কাতর কাক, রাস্তায় ছুটে যাওয়া ক্রিসক্রস গাড়ি
এইসব জমে থাকে না-লেখা কথায়
না-লেখা কথারা খুব সুদীর্ঘ হয় না কখনও
দাঁড়িকমাহীন আর ভাঙা ভাঙা উড়ে যাওয়া ছাঁদে
না-লেখা কথার দল ছেঁড়াখোঁড়া রক্তপলাশ
না-লেখা কথার পাশে কোনও কেউ আসে না কখনও
রাখে না উষ্ণ হাত মায়াভরে, খানিকক্ষণ ছুঁয়ে থেকে মৃদু
আয়নায় ভেঙে যায় কথাগুলো, সবকিছু সব যন্ত্রণা
ভেঙে চুরে দেখে সব চ্যাপ্টার, চশমার কাঁচ এবং অন্ধকার-রোদ
এভাবে ক্রমশ শেষে একদিন বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে যায় না-লেখা কথারা
হুকে গেঁথে ছিঁড়ে ফেলে যত্নে নির্মিত সব জাল এবং…
যার যা ছিল
দেবজাত
থাক বাতায়ন খোলা, খোলা দ্বার;
তবুও, আমি করবো না আর সোহাগী দরবার
তোমার যখন আন্ধারে মৌতাত—
বুকের ওপর নামিয়ে নেবো, চন্দ্রবিহীন রাত
কাজলচোখে, ছলাৎ ছলাৎ জল…
রাতের কার্ফু শিথিল হলে, দেখবে ফলাফল:
খামোশ তনু, তগদি রওয়াঙ্গি…
তৃপ্ত তুমি, আমিও, আমার একলাটি সঙ্গী
যার যা ছিল রইলো তেমন তার;
তোমার যেমন তিমির ছিলো, আমার অন্ধকার!
স্বরূপা
শঙ্খশুভ্র পাত্র
‘স্বরূপা’— নামের কোনও রূপময়ী শান্ত বালিকাকে
সুস্মিত দেখেছি, খণ্ড, কথা তার আমলকি-স্মৃতি
উড়িজলকরে যেন উড়ে-উড়ে নদীটার বাঁকে
দু’দণ্ড জিরিয়ে নেয়— এই তার আত্মগত-প্রীতি৷
কোমলস্বভাবা— এত যে আমল দেয়— ঘন-দেয়া
দেয়ালের বিপ্রতীপে— শিশুর দেয়ালা নিয়ে বাঁচে৷
শব্দে তাকে কী খেয়ালে ধরে রাখে আটপৌরে খেয়া
তরঙ্গ চিনেছে জল, ছল বুঝি আনাচে-কানাচে!
‘স্বরূপা’— বোধের! সে যে রৌদ্রস্নাত-অনিন্দ্যকুসুম,
বালুকাসম্ভব, নদী— বালিকার নিরবধি টান—
শিখাকে মিলায়, খুশি, পদাবলি, কীর্তনের ধুম
গোধূলি রঞ্জিত করে, ঘরে-ফেরা পাখিদের গান
আঁধার-কণিকা যেন— একে চন্দ্র, তারাময়ী, তারা
আকুল গগনে আত্মা-নিবেদিত— সম্মোহিত ধারা…
আমি তুমি আমি তুমি আমি
অরূপ আস
(উৎসর্গ : রাণা মিত্র)
তুমিও কি আমার মতো
দশকের ট্রেন ছেড়ে গেছে
আমি তুমি আমি তুমি আমি
চা গুমটির রিক্ত স্যশপ্যানে মলিন অপরাহ্ন
শূন্য বয়াম থেকে চিনির দানা
বয়ে নিয়ে যাচ্ছে পিপীলিকার দল
এসো বসা যাক এসো
মধ্যাহ্নের কথা হোক
সবুজ গাঁদালের পুষ্টিকর দুর্গন্ধের কথা হোক
নিশিপদ্ম বনচাড়াঁল এমনকি ফণীমনসার
কথাও হোক
এর মাঝে নীরবে পার হয়ে যাক
দশকজাদাদের ট্রেন…
আমি তুমি আমি তুমি আমি
শূন্য বয়াম থেকে
ফিরে যাচ্ছে পিপীলিকার দল…
প্রবীণ কবিদের
অবন্তিকা পাল
আড়ালে রোদ্দুর পোড়ে।
গোপন বারান্দার পাশে এসে বসে শালুকের ঘর।
এই পর, অপরের থেকে
নিজেকে বিচ্ছিন্ন ক’রে
লিখে রেখে যায় স্নেহ তোমাদের পায়ের পাতায়
সেখানে নিক্কণধ্বনি
সেইখানে ছলাৎ ছলাৎ
বহুতল থেকে নেমে চৌকাঠে এসে যেন
কৃপাপ্রার্থী হয়
তোমাদের জয়পরাজয়
তোমাদের ঝলমলে দিন, তোমাদের নিরহং রাত
অখ্যাত তরুণের কবিতার মতো
অবাধ্য মুঠোয় ধরা থাকে।
Advertisement



